বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। ফলে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত অন্যান্য হাসপাতালের চেয়ে এখানে চিকিৎসার খরচ বেশি হবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে বিএমইউর আইন সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। চলতি সংসদ অধিবেশনেই এই সংশোধনী বিল উঠতে পারে।
বিএমইউর কর্মকর্তারা জানান, হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই এই করপোরেট মডেল দরকার। এতে ভালো বেতন দিয়ে যোগ্য ও দক্ষ চিকিৎসকদের আনা সহজ হবে।
বিএমইউর উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সংসদে আইনের সংশোধনী পাস হলে এটি কোম্পানি আইনের অধীনে চলবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ মনে করেন, হাসপাতালটি কীভাবে চলবে এবং জনবল কীভাবে নিয়োগ হবে সেই সিদ্ধান্ত আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘আগে সিদ্ধান্ত নিলে এত দিন ধরে হাসপাতালটি এভাবে অলস পড়ে থাকত না।’
১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭৫০ শয্যার এই হাসপাতাল উদ্বোধন হয় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর জন্য নির্দিষ্ট জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বিএমইউর বর্তমান কর্মী ও বাজেট দিয়েই এখানে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
অধ্যাপক হামিদ বলেন, বেসরকারি কোম্পানি মডেলে হাসপাতালটি চালালে মধ্যবিত্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া হয়তো কিছুটা কমবে। তবে নিম্ন আয়ের মানুষেরাও যাতে এখানে চিকিৎসাসেবা পান, সে জন্য সরকারের উচিত একটি প্যাকেজ চালু করে তাতে ভর্তুকি দেওয়া।
মানুষের বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমাতে এবং বিশ্বমানের সেবা দিতে এই হাসপাতালে পাঁচটি বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হলো কার্ডিও অ্যান্ড সেরিব্রোভাসকুলার সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা সেন্টার, কিডনি রোগ ও ইউরোলজি সেন্টার এবং জরুরি ও ট্রমা সেন্টার।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে হাসপাতালটিতে কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও লোকবল নিয়োগের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি।
নতুন এই হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো জটিল অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা, যার জন্য খুবই দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল দরকার।
অধ্যাপক আজাদ বলেন, বর্তমান কাঠামোতে যে বেতন দেওয়া হয়, তাতে এই মানের জনবল পাওয়া সম্ভব নয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তারা আইনমন্ত্রীর মতামতও নিয়েছেন।
গত ৪ জুন বিএমইউ আইন সংশোধনের অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। নতুন বিধানে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে লাভজনক বা অলাভজনক কোম্পানি গঠন করতে পারবে। এসব কোম্পানির শেয়ারও কেনা যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হবে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ শেয়ার থাকবে।’
তিনি আরও জানান, নতুন নিয়মে সরকারিভাবে স্থায়ী নিয়োগের পরিবর্তে সব নিয়োগই চুক্তিতে হবে। পেশাদারদের খুঁজে বের করা, আগ্রহপত্র ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে।
ওই কর্মকর্তার মতে, একটি বিশ্বমানের বিশেষায়িত হাসপাতাল চালানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামোটি আমলাতান্ত্রিক। এখানে আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয়।
চিকিৎসার খরচ বাড়বে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খরচ বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। আপনি যদি একজন চিকিৎসককে ১০ লাখ টাকা বেতন দেন, তাহলে সেই আয় তো কোথাও না কোথাও থেকে আসতে হবে।’
একই কথা বলেন অধ্যাপক আজাদও। তিনি জানান, সেবার মানের দিক থেকে হাসপাতালটিকে শীর্ষ পর্যায়ের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে। তাই সেবামূল্য একটু বেশিই হবে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় আইসিইউর জন্য প্রতিদিন প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। আর বিএমইউর নিয়মিত হাসপাতালে এই খরচ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের আইসিইউ খরচ হয়তো এই দুইয়ের মাঝামাঝি থাকবে, দিনে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো হতে পারে।

