বর্ষায় ঝুঁকি জেনেও কেন পাহাড় ছাড়তে পারছে না চট্টগ্রামের হাজারো পরিবার

অবিরাম বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে বাড়ছে পাহাড়ধসের আশঙ্কা। আর এই শঙ্কার মধ্যেই নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়ে এখনো বসবাস করছে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার। অতীতে ভয়াবহ পাহাড়ধসে বহু মানুষের প্রাণহানি, বারবার উচ্ছেদ অভিযান, আদালতের নির্দেশ ও স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি—কোনোটিই তাদের পাহাড় থেকে সরাতে পারেনি। এখানে থাকা স্বল্প আয়ের মানুষজন বলছেন, কম ভাড়ায় থাকার বিকল্প না থাকায় মৃত্যুঝুঁকি জেনেও তারা পাহাড় ছেড়ে যেতে পারছেন না।

গতকাল সোমবার কক্সবাজারে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর পর থেকেই চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, নগরীর চিহ্নিত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনো ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার বসবাস করছে।

দ্য ডেইলি স্টারের এই প্রতিবেদক রৌফাবাদ মিয়া পাহাড়, চৌধুরী নগর পাহাড় ও ষোলশহর রেলওয়ে পাহাড় এলাকা ঘুরে দেখেছেন, বাসিন্দারা ঝুঁকির বিষয়টি সম্পর্কে জানলেও নিরাপদ বাসায় যাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় সেখানেই বসবাস করছেন।

রৌফাবাদ মিয়া পাহাড়ে প্রায় ১০০ থেকে ১২০টি পরিবার বসবাস করে। সেখানে পোশাকশ্রমিক কোহিনূর আক্তার (২৯) বলেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে বৃষ্টি চললেই তিনি উৎকণ্ঠায় ভোগেন।

তিনি বলেন, বৃষ্টি অনেক সময় চললে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বারবার বাড়ির পেছনের পাহাড়ের দিকে তাকাই। কাদা নামতে দেখলেই ভয় লাগে।

চৌধুরী নগর পাহাড়ে বসবাসকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ হাবিব বলেন, নিরাপদ জায়গায় যেতে তো অবশ্যই চাই। কিন্তু অন্য জায়গার বাসাভাড়া আমাদের সাধ্যের বাইরে। সাশ্রয়ী বিকল্প না পাওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই এখানে থাকতে হবে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল তিনটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৭৮ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা বশির আহমেদ জানান, আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে এবং পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

মাইকিং করে বাসিন্দাদের আটটি নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরিয়ে নিতে প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে।

বাংলাদেশ ল্যান্ডস্লাইড ডেটাবেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ২৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের জুনে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট পাহাড়ধসে ১২৮ জন প্রাণ হারান।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ পাহাড়ের ঢালে বা পাদদেশে বসবাস করেন। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি, দুর্বল নিষ্কাশনব্যবস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত—এসবই পাহাড়ধসের প্রধান কারণ।

গবেষণায় বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, আকবরশাহ, কুসুমবাগ, বায়েজিদ বোস্তামী, রৌফাবাদ, ফয়েজ লেক ও খুলশীকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মস্থলের কাছাকাছি অবস্থান, কম ভাড়া এবং সহজে জায়গা পাওয়ার কারণে এসব পাহাড়ে অনানুষ্ঠানিক বসতি গড়ে উঠেছে। বাসিন্দাদের বেশির ভাগই রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, দিনমজুর, গৃহকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যাদের পক্ষে অন্যত্র বাসা ভাড়া নেওয়া কঠিন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, বাংলাদেশের পাহাড় প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় ভূতাত্ত্বিকভাবে বেশি নাজুক।

তার ভাষায়, আমাদের পাহাড় নরম ও আলগা মাটি দিয়ে গঠিত। সামান্য পাহাড় কাটাও ঢালকে অস্থিতিশীল করে তোলে। আর দীর্ঘ সময়ের বৃষ্টিপাতই অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ধসের তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের অনেক পাহাড় ইতোমধ্যে সমতল করে ফেলা হয়েছে। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোরও অধিকাংশে গাছপালা নেই। ফলে সেগুলো আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অলক পালের মতে, অবশিষ্ট পাহাড় রক্ষা করতে হলে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থানান্তর এবং ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে শুধু পাহাড়ই নয়, চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যও হারিয়ে যাবে।

এদিকে উচ্ছেদ অভিযান চললেও অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পাহাড় কাটা ঠেকাতে ৫০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, অবৈধ পাহাড় কাটা এখনো ব্যাপকভাবে চলছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বড় বড় দুর্ঘটনার পর বহু আলোচনা হলেও অপরিকল্পিত বসতি, পাহাড় কাটা ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান হয়নি।

তিনি বলেন, সাশ্রয়ী আবাসন ও স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে প্রতি বর্ষায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ কেবল সাময়িক সমাধান হয়েই থাকবে।

হাজারো পরিবার উচ্ছেদের পরও কেন আবার পাহাড়ে ফিরে আসে—এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমরা উচ্ছেদ করি, কিন্তু পরে তারা আবার ফিরে আসে। কারণ খুব কম ভাড়ায় সেখানে থাকার সুযোগ পায়। স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে তাদের পাহাড় থেকে দূরে রাখা কঠিন।

 

Related Articles

Latest Posts