‘বছরটা কী করে কাটাব?’

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর হাওরের ৬০ বছর বয়সী কৃষক সুরধন সূত্রধর। ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন কোমর-সমান পানিতে, তুলছেন আধপাকা কিংবা পচা ধান। 

কাছেই তার স্ত্রী সুবাশী সূত্রধর খোলা জায়গায় ওই ভেজা ধান মাড়াই ও শুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু একটা দুর্গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

এবারের আকস্মিক বন্যায় এ পরিবারের ৭ বিঘা বোরো ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

‘ঘরে কোনো খাবার নেই,’ কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন সুবাশী। 

‘বছরটা কী করে কাটাব? ভাবতেও পারছি না।’

সুবিদপুর গ্রামজুড়ে একই দৃশ্য। এখানকার অন্তত ২০০ কৃষকের ফসলি জমি ডুবে গেছে বন্যার পানিতে।

সুবাশী জানান, এ মৌসুমে জমি চাষ করতে তাদের প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যার বেশিরভাগই ঋণের মাধ্যমে জোগাড় করা। শ্রমিকরা পানিতে নামতে রাজি হচ্ছে না। 

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী ও ছেলে যতটুকু পারছে ধান কেটে নৌকায় করে আনছে। কিন্তু তার বেশিরভাগই ইতোমধ্যে পচে গেছে। শুকিয়ে নিলেও তা খাওয়ার যোগ্য থাকবে কি না, সন্দেহ আছে।’

পরিবারটির কাঁধে ৯০ হাজার টাকার ঋণের বোঝা। সঙ্গে যোগ হয়েছে বছরজুড়ে নিজেদের খাবারের অনিশ্চয়তা।

পাশের এলাকার কৃষকরাও একই ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। সুবিদপুরের রুবিনা ও সফরতি সরকার দম্পতি, উমেদনগরের হান্নান খান, মৃণাল সরকার ও মোহন মিয়া জানান, তাদের পাঁচ থেকে ৫০ বিঘা পর্যন্ত জমির পুরোটাই ডুবে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে তথ্যমতে, লাখাই, নবিগঞ্জ, বানিয়াচং ও আজমিরিগঞ্জ উপজেলার ধানের জমি সম্পূর্ণভাবে ডুবে গেছে।

সুবিদপুরের আরেক বাসিন্দা গোপেন্দ্র সরকার বলেন, ‘গত বুধবার বানিয়াচং-এর সাতমুখ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধের একটি অংশ ধসে পড়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ফলে চারটি ইউনিয়নের ৫০টিরও বেশি হাওরে পানি ঢুকে পড়েছে।’

‘ক্ষতিগ্রস্ত হাওরগুলোর মধ্যে রয়েছে সাতমুখ, পুব্বিলা, আন্দরবদা, পঞ্চবিল, ভুট্টুক, খালপার, সিঙ্গারবিল, কালিবাড়ির ঢালি, মাইজার কান্দা, ঔদাওইল, চণ্ডীপুর, হাগা ও সুজাতপুর, যার বেশিরভাগই এখন পানির নিচে,’ যোগ করেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষকরা গলা-সমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন। কখন তাদের শরীর কেটে যাচ্ছে, শিকার হচ্ছেন জোঁকের কামড়ের। বেশি মজুরি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও অনেকেই শ্রমিক পাচ্ছেন না।

উমেদনগরের হান্নান খান বলেন, ‘পানির স্তর এখনও উঁচু। সেইসঙ্গে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় আশঙ্কা হচ্ছে যে সামনের দিনগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ফলে আগামী বছর হাজার হাজার মানুষ তাদের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়বেন।’ 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই মৌসুমে হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ ও ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।’

‘হঠাৎ করে পানি বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে ১২ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ নিরূপণ এখনও চলছে,’ বলেন এ কৃষি কর্মকর্তা।

Related Articles

Latest Posts