বাবা ‘বাংলা বাঘ’। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। কিংবদন্তীতুল্য শিক্ষাবিদ, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ছেলে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। রাজনীতিবিদ, ব্যারিস্টার, শিক্ষাবিদ।
ইতিহাস বলছে—ছাত্রাবস্থাতেই শ্যামাপ্রসাদ তার উপাচার্য পিতাকে শিক্ষা-পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন।
ভারতবাসীর কাছে শ্যামাপ্রসাদের মূল পরিচয় একজন রাজনীতিক। ছিলেন জওহরলাল নেহেরুর মন্ত্রিসভার সদস্য।
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শ্যামাপ্রসাদকে প্রাতঃস্মরণীয় রেখেছে মূলত ২ কারণে।
তিনি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলাকে ভেঙে হিন্দুদের জন্য পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গড়তে সহায়তা করছিলেন এবং তিনি বিজেপির পূর্বসূরি দল ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা।
১৯৫১ সালে শ্যামাপ্রসাদ দিল্লিতে জনসংঘ গড়েছিলেন, যা ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টি ও ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির রূপ নেয়। জনসংঘের প্রতীক ‘প্রদীপ’ হলেও বিজেপি নেয় ‘পদ্ম’।
শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আবার বিজেপিকে জানতে গেলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক বা আরএসএস সম্পর্কে জানতে হয়। কেননা, বিজেপি এই দুই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বিজেপি পরিচিতি পুস্তিকায় ‘এর দরজা জাতি-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে সব ভারতীয়ের জন্য উন্মুক্ত’ বলা থাকলেও তা ক্রমশ সংখ্যালঘু বা মুসলিমবিরোধী দল হিসেবে বিকশিত হতে থাকে।
ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৮০ দশকে অযোধ্যায় ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে রাম মন্দির নির্মাণের দাবি ও কর্মসূচি নিয়ে এগোতে থাকা বিজেপি ধীরে ধীরে দিল্লির মসনদ অধিকার করে বসে।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর ২০২৪ সালে সেখানে রাম মন্দির তৈরির পর আজো পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির শীর্ষ নেতাদের ভাষণে-বক্তৃতায় শোনা যায়—‘শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় মুসলমানদের ঠাঁই নেই।’
সমালোচকরা বলছেন—বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কট্টর বিজেপিবিরোধী অবস্থানে দেখা গেলেও একসময় তার ‘হাত ধরেই’ বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ‘মাটি’ পেয়েছিল।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই বিজেপি এখন মমতার জন্যই ‘হুমকি’।
এ ক্ষেত্রে তারা মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৯৯ সালে বিজেপি জোট দিল্লিতে সরকার গঠন করলে এর শীর্ষনেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী হন প্রধানমন্ত্রী আর তার রেলমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতা সেই পদে ছিলেন ২০০১ সাল পর্যন্ত।
বিজেপির সঙ্গে মমতার সখ্যতা আরও এক দশক টিকেছিল বলেও জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের ভাষ্য: ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের রাজত্ব সরাতে বিজেপিরও ‘হাত’ ধরেছিলেন মমতা।
এর দেড় দশক পর এখন সেই বিজেপিই মমতার ‘ঘুম নষ্ট’ করছে ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলে।
তবে বিজেপির ভাষায় ‘শ্যামাপ্রসাদের বাংলা’য় তারা ‘শূন্য থেকে শেখরে’ ওঠার চেষ্টা ক্রমাগত করে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দলীয় পরিচিতি সংক্রান্ত সেই পুস্তিকায় আরও বলা আছে—এটি একটি ‘কর্মী-নির্ভর’ বা ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন। তারা নিজেদের ‘একটু অন্য ধরনের’ দল বলে মনে করে।
বিজেপির দৃষ্টিতে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা এক ধরনের ‘ভণ্ডামি’। পুস্তিকাটিতে আরও বলা হয়েছে, ‘এই তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা—যা আদতে এক নির্লজ্জ সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া আর কিছু নয়—দেশের সর্বনাশ করেছে।’
দলটিতে পূর্ণকালীন ও আংশিককালীন কর্মী ও কর্মকর্তা আছেন বলেও এতে জানানো হয়।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বেশ মিল পান। তারা মনে করছেন, ‘বামের ভোট রামে যাচ্ছে বলেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এত বাড়বাড়ন্ত’।
২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির উত্থান কীভাবে হলো?’
পশ্চিমবঙ্গকে এক সময়ে বামপন্থিদের ‘দুর্গ’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়—গত কয়েকটি নির্বাচনের ফলাফল দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, হিন্দুত্ববাদী বিজেপিও রাজ্যে দ্রুত তাদের ভোট ব্যাংক বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
এতে এক ভোটারের জবানীতে বলা হয়, ‘আমার বাবা সিপিএম পার্টি করেছেন চিরকাল। যবে থেকে আমার জ্ঞান-বুদ্ধি হয়েছে, তবে থেকে আমিও সিপিএম করে এসেছি। কিন্তু, গত বছর স্থানীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে আমরা গ্রামের সবাই সিদ্ধান্ত নিই যে বিজেপি-তে যোগ দেবো।’
‘ওই ভোটে বিজেপির হয়ে আমরাই পঞ্চায়েত দখল করতে পেরেছি,’ বলেও জানান তিনি।
অপর একজন সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘কমিউনিস্ট পার্টি তো আমার রক্তে। সেটা তো কোনোদিন যাবে না। কিন্তু, শুধু আমি না, গ্রামের সব লোকেই বলেছে, যদি বাঁচতে হয়, তাহলে বিজেপিই করতে হবে। কেন্দ্রে এখন বিজেপি আছে। রাজ্যেও একটা হাওয়া আছে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপি একটি কর্মী-নির্ভর দল হওয়ায় একজন বামকর্মীর জন্য অন্য যেকোনো দলের তুলনায় বিজেপির কর্মী হওয়া সহজ। তাই পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পর বামকর্মীদের জন্য ‘রাম’-কর্মীদের কাছে আশ্রয় নেওয়া বেশি স্বস্তিকর। কেননা, বাম সংগঠনগুলোও বেশ কর্মী-নির্ভর।
গত ১৬ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকার এক নির্বাচনী বিশ্লেষণে অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মইদুল ইসলাম বলেছিলেন, তৃণমূলের সদস্য কীভাবে হতে হয় তা দলটির নেতা-মন্ত্রীদের কেউ বলতে পারেননি।
তার মতে, এই দুই দলের মধ্যে সাংগঠনিক মিল থাকায় সিপিএমের বহু মানুষ বিজেপিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।
অনেকের মতে—সিপিএমের যেমন একটি সুস্পষ্ট আদর্শ আছে, তেমনি বিজেপির আদর্শও সুস্পষ্ট। সিপিএমের যেমন কর্মীবাহিনী আছে, তেমনি বিজেপির কর্মীবাহিনী আছে। তাই ‘বামে-রামে এত মিল’।
বিশ্লেষকদের একাংশের বিশ্বাস, তৃণমূল যেহেতু বামফ্রন্টের সরকারের পতন ঘটিয়েছে, তাই বাম দলগুলোর কর্মীরা নিজেদের রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের ‘হাত’ থেকে বাঁচাতে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির কাছে আশ্রয় নিয়েছেন।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানায়—২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসা তৃণমূলের প্রতি জনসমর্থন ছিল ৪৬ শতাংশ।
সেসময় বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস জোটের প্রতি জনসমর্থন ছিল ৪০ শতাংশ। বিজেপির সমর্থন ছিল ১০ শতাংশ।
কমিশনের সূত্রে আরও জানা যায়—২০১১ সালে সেই সময়ের রেকর্ড ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটের মধ্যে তৃণমূল এককভাবে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ ও তৃণমূল নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।
সেসময় বিজেপির ভোট ছিল ৪ শতাংশ।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এই হার হয়—তৃণমূল ৪৭ শতাংশ ৯৪ শতাংশ ও প্রধানবিরোধী হয়ে ওঠা বিজেপি ৩৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।
২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি ৪ শতাংশ ভোট পেলেও ২০২১ তা হয় ৩৮ শতাংশের বেশি।
আবার একটু ফিরে আসা যাক বিবিসির সেই প্রতিবেদনে।
এতে অপর এক ভোটারের জবানীতে বলা হয়েছে: ‘তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে সিপিআইএমের খুব কঠিন সময়েও আমরা পার্টির সঙ্গেই ছিলাম। গ্রামের মানুষের একটা অংশ নরেন্দ্র মোদির হাওয়ার কারণেই হোক বা বিজ্ঞাপনের জন্য হোক, তারা বিজেপি-কে চাচ্ছে।’
‘তাই সবাই মিলে বিজেপির দিকে আমরা ঝুঁকেছি,’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত বিধানসভার ভোটে যেমন ধর্মই মূল আলোচ্য বিষয় হয়েছিল এবারের নির্বাচনেও তা দেখা গেল।
এবার এতটাই মেরুকরণ হয়েছে, রাজ্য বিজেপির নেতারা বলেছেন তাদের মুসলিম ভোটের প্রয়োজন নেই।
ধারণা করা হয়, রাজ্যটিতে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার মুসলিম। তবুও বিজেপি এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কোনো মুসলিম প্রার্থী দেয়নি।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন যে রাজ্যে শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব। রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণনীতির অভিযোগ এবং বিজেপির কঠোর ভৌগোলিক ও ধর্মীয় বিভাজনের বাণী পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া ও রাজ্য-রাজধানী কলকাতা থেকে বহু দূরের উত্তরবঙ্গ হিসেবে পরিচিত জেলাগুলোয় তৃণমূলবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে সাফল্য পেয়েছে বিজেপি।
হিমালয়ের কোল ঘেঁষা পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় বিশেষ করে বিক্ষুব্ধ বৃহত্তর দার্জিলিংয়ে বিজেপি ক্ষমতাসীন তৃণমূলবিরোধী রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলে।
কেন্দ্রে নিজেদের সরকার থাকায় রাজ্য-বিজেপি উত্তরবঙ্গের অধিবাসীদের আলাদা কেন্দ্রশাসিত রাজ্য গড়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, তবু সেই অঞ্চল এখন বিজেপির ‘দূর্গে’ পরিণত হয়েছে।
উত্তরের জেলাগুলোয় বিজেপির ভৌগোলিক বিভাজন বা সম্ভাব্য ‘বঙ্গভঙ্গের’ রাজনীতি সুফল দেওয়ায় দলটি ধর্মীয় বিভাজনের মন্ত্র নিয়ে দক্ষিণবঙ্গ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ জেলাগুলোয় প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের তুলনায় বেশি আসন পাওয়া বিজেপি এখন ভাবছে দক্ষিণবঙ্গে কয়েকটি আসন পেলে তারা সরকার গড়ার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। তাই দলটি বিভাজন বা ধর্মীয় মেরুকরণের পাশাপাশি বলছে যে কেন্দ্রে বিজেপির সরকার থাকায় যদি রাজ্যেও বিজেপি সরকার গড়তে পারে তাহলে রাজ্যে দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব।
এই ব্যবস্থাকে বিজেপি ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ বলে আখ্যা দিচ্ছে।
বিজেপির এমন বয়ান অনেক ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশের বিশ্বাস।
এসব কৌশলের কারণে বিজেপি এখন তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে কলকাতায় সরকার গড়ার স্বপ্ন দেখছে। আর ‘নিঃশ্বাস’ ফেলছে তৃণমূলপ্রধান মমতার ঘাড়ের ওপর।
তবে আগামীকাল ৪ মে বোঝা যাবে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ‘পদ্ম’ ফোটাতে কতটা সফল হয়েছে।

