প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন করেছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা, তিস্তা প্রকল্পে অগ্রগতি, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরুর আশ্বাস, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনা ত্বরান্বিতকরণ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার মতো বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে আজ শনিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
চীন সফরে নতুন উচ্চতায় সম্পর্ক, তিস্তা ও আঞ্চলিক সংযোগে অগ্রগতি
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সম্মেলনে বিশ্বের উদীয়মান শক্তিগুলোর অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অগ্রণী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ডব্লিউইএফের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ফোরামের বার্ষিক সভায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপনের প্রস্তাব দেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন ডব্লিউইএফের সিইও।
চীন সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ‘সার্বিক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ (কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ) থেকে ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ (চায়না-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ অ্যা শেয়ার্ড ফিউচার) পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালু এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ‘২+২ ডায়ালগ মেকানিজম’ চালুর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। পাশাপাশি ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় বড় ও ছোট জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও সম্মতি হয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যম সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ৮টি সমঝোতা স্মারক, ৩টি চুক্তি, একটি প্রটোকল এবং একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা (জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যান) সই হয়েছে।
এছাড়া বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দুটি চুক্তি এবং একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের লক্ষ্যে কুনমিং থেকে বাংলাদেশের বন্দরগুলো পর্যন্ত মাল্টিমোডাল পরিবহন সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া চীন প্রস্তাবিত চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিআইএম) নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে।
তিস্তা নদী ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে এবং বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে চীন সম্মত হয়েছে।
এ ছাড়াও সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, নদী খনন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্রিকস, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) বাংলাদেশের যোগদানে চীন পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, এফটিএ ও বিনিয়োগ সহযোগিতায় অগ্রগতি
মালয়েশিয়া সফরের অর্জনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কিৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণ বিষয়ে মন্ত্রী পর্যায়ে দুটি নোট বিনিময় করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক (বাইলেটারাল কনসালটেশন মিটিং) দ্রুত পুনরায় শুরু করার বিষয়ে উভয় দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা দ্রুত শুরু এবং ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত ও ভবিষ্যতমুখী চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যেও দুই দেশ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
এছাড়া মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ যৌথ বিজনেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
শ্রম খাতে সহযোগিতার বিষয়ে নিরাপদ, নিয়মিত ও স্বচ্ছ অভিবাসনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু, দক্ষ কর্মী পাঠানো, অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আট হাজার বাংলাদেশি কর্মীর কাজে যোগদানের বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন।
এছাড়া মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ও নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশি কর্মীদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়োগ ব্যয় কমানোর বিষয়েও উভয় দেশ একমত হয়েছে।
যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকের মাধ্যমে বিদ্যমান শ্রমবিষয়ক সমঝোতা স্মারক মূল্যায়ন এবং বর্তমান প্রয়োজনের আলোকে নতুন বা হালনাগাদ সমঝোতা স্মারক প্রণয়নের বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মালয়েশিয়া সক্রিয় ভূমিকা পালনের আশ্বাস দিয়েছে। আসিয়ান কাঠামোর আওতায় বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে সংকট সমাধানের সম্ভাব্য উপায় নির্ধারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মালয়েশিয়া পুনরায় সমর্থন জানিয়েছে এবং আসিয়ান কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা আরও জোরদারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।
এছাড়া জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, বৈদ্যুতিক যানবাহন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বন্দর ও লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকার খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশ সফরে অর্জনের বিষয়টি উপস্থাপন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এছাড়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ও হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

