গলদা চিংড়ির পোনার সংকটে বিপাকে পড়েছে বাগেরহাটের চাষিরা। পোনার সরবরাহ বাড়াতে ইতোমধ্যে বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনে ফিরতে চিঠি দিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিষ্ক্রিয় হ্যাচারি ও নার্সারিগুলো লাইসেন্স নবায়ন করে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু না করলে লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে।
জেলার হ্যাচারিগুলোর লাইসেন্সের বৈধতা, উৎপাদন ক্ষমতা ও কার্যক্রম যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন, বাগেরহাটের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজ কুমার বিশ্বাস।
জেলা মৎস্য বিভাগের পরিদর্শনে উঠে এসেছে, বাগেরহাটে লাইসেন্সপ্রাপ্ত আটটি গলদা হ্যাচারির মধ্যে চারটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এগুলো হলো—সদর উপজেলার ফুলবাড়ী এলাকার ব্র্যাক হ্যাচারি, বাগেরহাট প্রন হ্যাচারি, মোরেলগঞ্জের রূপা গলদা হ্যাচারি ও কচুয়া উপজেলার বাধাল এলাকার রেইনবো হ্যাচারি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্রাদার্স ল্যাব ২০১৮ সালে লাইসেন্স পেয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করেছে।
এছাড়া ২০২৩ সালে বাগেরহাট প্রন হ্যাচারি ও গত বছর রূপা গলদা হ্যাচারির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, মালিকের মৃত্যুর পর থেকে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে রত্না নার্সারি।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটের গলদা হ্যাচারিগুলোতে বছরে প্রায় ১০ কোটি পোস্ট-লার্ভা (পিএল) উৎপাদিত হতো।
বাগেরহাটে সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১১টি হ্যাচারি রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৩ কোটি পিএল।
হ্যাচারিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে পোনা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে চাষের মৌসুমে প্রয়োজনীয় পোনা সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা।
কচুয়া উপজেলার সাংদিয়া গ্রামের চাষি আবুল হোসেন খান বলেন, ‘চাহিদা মতো মানসম্মত পোনা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে মৌসুমের শুরুতেই আমাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’
পোনা সংকটের পাশাপাশি দাম নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন চাষিরা। মৎস্য অফিস প্রতি পিএলের দাম চার টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করলেও সংকটের কারণে চাষিদের পাঁচ থেকে সাত টাকা বা তারও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য হ্যাচারি থেকে পোনা না পেয়ে অনেকে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে সংগ্রহ করছেন।
সাংদিয়া গ্রামের চাষি গোপাল দাস বলেন, গলদা চাষ টিকিয়ে রাখতে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে নিয়মিত পোনা পাওয়া জরুরি।
একই কথা বলেন ভাণ্ডারখোলার চাষি রায় গৌতম মনা ও নরেন্দ্রপুরের সোহান শেখ।
চাষিদের ক্ষতির পাশাপাশি দক্ষ কর্মী হারাচ্ছে হ্যাচারি ও নার্সারি পরিচালকরা। একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন পরিবহনশ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
বাগেরহাটের চিংড়িচাষি সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
চাষিরা বলেন, কেবল বন্ধ হ্যাচারি চালুর নোটিশ দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। মানসম্মত পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি হ্যাচারি ও নার্সারিগুলোতে নিয়মিত তদারকি করতে হবে।
যোগাযোগ করা হলে ব্র্যাক ফিশারিজ এন্টারপ্রাইজের সহকারী মহাব্যবস্থাপক এ টি এম রবিউল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া ও পরিচালনাগত জটিলতার কারণে বাগেরহাটের হ্যাচারিটি বন্ধ করতে তারা বাধ্য হয়েছেন।
‘উৎপাদনের জন্য সমুদ্রের মাঝামাঝি এলাকা থেকে পানি সংগ্রহ করে আনতে হয়। এটি ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া,’ যোগ করেন তিনি।
রবিউল আরও বলেন, ‘বারবার ভাইরাসের সংক্রমণ ও রোগবালাইয়ের কারণে চিংড়ি মারা যায়। এসব কারণে গলদা চাষ কমেছে। অনেকে বাগদা চিংড়ি চাষে ঝুঁকেছেন।’
ব্র্যাক বর্তমানে ওয়ার্ল্ডফিশের সহযোগিতায় বরিশালে একটি গলদা হ্যাচারি পরিচালনা করছে বলে জানান রবিউল।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশে বা সাদা চিংড়ির বাণিজ্যিকভাবে চাষ সম্প্রসারিত হলে আগামী তিন বছরে চিংড়ি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।
‘নিরিবিলি নামে একটি প্রতিষ্ঠান ভেনামি চিংড়ি নিয়ে কাজ করার বিশেষ অনুমতি পেয়েছিল। সম্প্রতি ব্র্যাক ফিশারিজ এন্টারপ্রাইজও ভেনামি নিয়ে কাজ করতে সরকারের অনাপত্তিপত্র পেয়েছে। এছাড়া, ব্রুডস্টক আমদানি করে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
গলদা চিংড়ির পোনা সরবরাহ বাড়াতে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্র্যাক হ্যাচারি কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স বাতিল চেয়ে আবেদন করেছে। তবে রূপা গলদা হ্যাচারির মালিকপক্ষ জানিয়েছে তারা আবার উৎপাদনে ফিরবে।’
রাজ কুমার বলেন, ‘এছাড়া, সরকারিভাবে আরও একটি হ্যাচারি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
বন্ধ হ্যাচারি বা নার্সারি চালু এবং পরিচালনায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সে রকম কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই।’

