২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর ‘ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন’।
ততদিনে গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালানোয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তাতে সমর্থন দেওয়ায় মার্কিন জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন বাইডেন।
বাইডেনের পুরো মেয়াদ জুড়ে গাজায় হামলা চালিয়ে গেছে ইসরায়েল এবং বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১০ মাস ধরে অব্যাহত ছিল।
তখন থেকেই সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব এবং ‘হতাশাপূর্ণ’ ফোনালাপের তথ্য প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র ইসরায়েলের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনে চির ধরেছে বলে জানা যায়নি।
কিন্তু চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও গালিগালাজে ভরা আরেকটি ফোনালাপের কথা সামনে এসেছে। বেনামী সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে তা নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছে।
গত সোমবার অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুকে ‘পুরো উন্মাদ’ বলেছেন ট্রাম্প এবং লেবাননে হামলার জন্য তিনি ভর্ৎসনা করেন।
সেদিন দক্ষিণ লেবাননের আল-মারওয়ানিয়াহ শহরে ইসরায়েলি হামলায় ২ শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে বাগবিতণ্ডার তথ্য ফাঁস হলেও দুই দেশের নীতিই প্রকৃতপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই নীতিগুলোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন খুব কমই দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকার বিষয়ক সংস্থা ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল অ্যাকশনের পলিসি বিষয়ক পরিচালক রায়ান কস্টেলো আল জাজিরাকে বলেন, নেতানিয়াহুর ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষোভ নিয়ে যে প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ হয়েছে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা সেগুলো নিয়ে এখন ‘হাসাহাসি’ করছেন।
‘বাস্তবে কী ঘটছে, সেটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ,’ বলেন তিনি।
দুই প্রশাসনের একই প্রতিবেদন
নেতানিয়াহুকে ধমক দিয়েছেন ট্রাম্প—এমন প্রতিবেদনের পরও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকার গোষ্ঠী ‘ডন’ অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার ইসাবেল হেসলিপ বলেন, মার্কিন নীতি ইসরায়েলের স্বার্থের সঙ্গে এখনো সঙ্গতিপূর্ণ আছে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের মতো একজন ক্ষমতাশালীর ফোনালাপের কথা একটিমাত্র সূত্রের বরাতে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তিনি ফোন তুলে মার্কিন নীতি ভঙ্গ করার জন্য নেতানিয়াহুকে চিৎকার করে বকাঝকা করছেন। আসলে এটি পলিসির প্রতিফলনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে নেতানিয়াহু ঠিক যা চাচ্ছেন তা-ই পাচ্ছেন।’
‘ইসরায়েলের কার্যক্রমের ওপর ট্রাম্পের কোনো শেষ কথা বলেননি। পূর্বসূরিদের মতো তিনিও মার্কিন জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে সম্পূর্ণ অপারগ প্রমাণিত হয়েছেন। বরং, তার পরিবর্তে ইসরায়েলের সাম্রাজ্যবাদী খামখেয়ালিকেই তিনি প্রশ্রয় দিচ্ছেন,’ যোগ করেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা শুরু করলে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিকদের কাছ থেকেই নয়, নিজ দলের লোকজনের কাছ থেকেও চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন।
এই সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বেড়ে গেছে মূল্যস্ফীতি।
এর মধ্যেই দুই নেতার কথোপকথন নিয়ে সবশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হলো।
সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়েছেন, যা ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার নয়।
গত এপ্রিলে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা, বৈরুতে বোমা হামলার হুমকি এবং কুয়েত-বাহরাইনে ইরানের হামলার কারণে যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা কমে আসছে।
ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কারণে তারা যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখছেন না।
এর আগে, ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি নেতানিয়াহু ও হিজবুল্লাহর এক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং উভয়পক্ষ ‘সব ধরনের হামলা-পাল্টা হামলা’ বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।
কিন্তু এরপরই নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ‘দক্ষিণ লেবাননে পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে যাবে’।
সেখানে তারা আরও আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে এবং শহরগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, মার্কিন সমর্থন ছাড়া লেবানন ও এ অঞ্চলে ইসরায়েলি নৃশংসতা চালানো সম্ভব নয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় হামলা শুরু করার পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করলে তা প্রতিহত করতেও সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বেশ কয়েকবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবেও ভেটো দিয়েছে।
এরপরেও নেতানিয়াহুর ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রেগে আছেন—বেনামে এমন খবর নিয়মিত গণমাধ্যমে আসছে।
এ ধরনের প্রতিবেদনগুলোর পেছনে মার্কিন কর্মকর্তারা আছেন বলে উল্লেখ করা হলেও দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের দুটি পৃথক প্রশাসনের আমলে একই ধরনের বার্তার তথ্য কীভাবে সামনে আসে, তা স্পষ্ট নয় বিশ্লেষকদের কাছে।
‘ক্ষোভের উপশম’
প্রকাশ্যে বাইডেন ও ট্রাম্পের সহযোগীরা ইসরায়েলের সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছেন। ট্রাম্প নিয়মিত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন এবং একাধিকবার বলেছেন যে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ছাড়া ইসরায়েলের অস্তিত্বই থাকত না।
গত ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় এক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ‘নায়ক’ বলেও উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প সেবার নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘আমরা আপনার সঙ্গে আছি এবং থাকব।’
এর ২ সপ্তাহ আগে অ্যাক্সিওস একটি প্রতিবেদন জানায়, গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় নেতানিয়াহুকে ‘তিরস্কার’ করেছে হোয়াইট হাউস।
পত্রিকাটি এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে লিখেছিল, ‘নেতানিয়াহুর প্রতি হোয়াইট হাউসের বার্তা ছিল—আপনি যদি নিজের সুনাম নষ্ট করতে চান এবং দেখাতে চান যে আপনি চুক্তি মানেন না, সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু গাজায় চুক্তি করার পর আমরা আপনার কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সুনাম নষ্ট হতে দেবো না।’
হোয়াইট হাউসের উচ্চ-পর্যায়ের ফোনালাপের সঠিক তথ্য খুব কম মানুষই জানতে পারেন।
তবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বিশ্বনেতাদের কথোপকথনের সময় কখনো কখনো জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ ফোনালাপ ফাঁসের একটা উদ্দেশ্য হতে পারে যুদ্ধ নিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করা। দেখানো হয় যে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রতি কঠোর।’
মোর্তাজাভি বলেন, ‘অজনপ্রিয়, বেআইনি ও অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তা কিছুটা উপশম করার এটি একটি উপায় হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর মাধ্যমে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে তা হলো, “দেখুন, আমরা ইসরায়েলের ওপর খুব রেগে আছি। আমরা তাদের ধমক দিই, তিরস্কার করি”।’
তবে মোর্তাজাভি জোর দিয়ে বলেন, ‘এসব বাগাড়ম্বর প্রতিবেদনের চেয়ে মার্কিন নীতি দেখা বেশি জরুরি। এগুলো কি মাঠের বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন আনে?’
তথ্য যুদ্ধ
ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল অ্যাকশনের পলিসি পরিচালক রায়ান কস্টেলোর যুক্তি হলো, মূলত ইরানকে লক্ষ্য করে এসব কথোপকথনের তথ্য ফাঁস করা হয়েছে।
কস্টেলো বলেন, ‘আমি এটিকে (কথোপকথন ফাঁস) মূলত ইরানিদের জন্য একটি সংকেত হিসেবে দেখছি, যেখানে ট্রাম্পকে আন্তরিক দেখানো হচ্ছে। লেবাননে যা ঘটছে এবং সেখানে ইসরায়েলের হামলাকে তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনার একটা দূরত্ব রাখতে চান।’
‘এই ভর্ৎসনার পর ইসরায়েলের নীতিতে আসলে কতটা পরিবর্তন এসেছে তা দেখার বিষয় এবং আমি মনে করি নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে অবাধ্য থাকার কারণ রয়েছে,’ বলেন তিনি।
এদিকে অ্যাক্সিওস তাদের প্রতিবেদনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটির মুখপাত্র জেক উইলকিন্স আল জাজিরাকে একটি ইমেইলে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিবেদনের পক্ষে আছি। সেখানে এটিও উল্লেখ করা হয়েছে যে “আগেও ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে বেশ কয়েকবার উত্তেজনাপূর্ণ ফোনালাপ হয়েছে। তবে তারা ইরান ও অন্যান্য ইস্যুতে এখনো ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে যাচ্ছেন।’
মোর্তাজাভি সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সব পক্ষই এই সংঘাত সম্পর্কে সাধারণ মানু্ষের ধারণাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।’
তিনি ‘ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পদত্যাগের’ গুজবের দিকেও ইঙ্গিত করেন। এটি গুজব বলে পেজেশকিয়ানের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছিল।
মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি বহুমুখী (হাইব্রিড) যুদ্ধ। যুদ্ধক্ষেত্রের যুদ্ধ, গোয়েন্দা যুদ্ধ, বয়ানের যুদ্ধ, এবং এর সঙ্গে তথ্য যুদ্ধও রয়েছে, যার মধ্যে অপপ্রচার, অর্ধ-সত্য এবং কৌশলগত তথ্য ফাঁসও অন্তর্ভুক্ত।’

