নিখোঁজ মার্কিন ক্রু ইরানের হাতে ধরা পড়লে কী হতে পারে?

ইরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়ে একজন ক্রু নিখোঁজের ঘটনায় দেশটির উদ্বেগ বাড়ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ওই ক্রু ইরানের হাতে ধরা পড়লে তেহরান তাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দরকষাকষির বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

আজ শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে আসে অতীতের জিম্মি কূটনীতিসহ বর্তমান প্রেক্ষাপট।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে ইরান। এর দুজন ক্রুয়ের মধ্যে একজনকে জীবিত উদ্ধার করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অপরজনের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর পাশাপাশি ইরানি সামরিক বাহিনীও ওই ক্রুকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ওই ক্রুকে কেউ জীবিত আটক করে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে পারলে ৫০ হাজার পাউন্ড পুরস্কার দেওয়া হবে।

নিখোঁজ ওই ক্রুয়ের সন্ধানে রীতিমত প্রতিযোগিতায় নেমেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ওই মার্কিন ক্রুকে কে আগে উদ্ধার করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী চাল।

একইসঙ্গে এই ঘটনা অতীতে ইরানের জিম্মি কূটনীতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।  

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭৯ সালে ইরানে জিম্মি সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সে সময় তেহরানে সশস্ত্র শিক্ষার্থীদের একটি দল মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন আটকে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি একটি মর্মান্তিক ঘটনা। আর এ ঘটনাই দীর্ঘ পাঁচ দশক দুই দেশের সম্পর্কে বৈরিতার ভিত্তি তৈরি করে।

 

এরপর থেকে ইরান একাধিকবার বিদেশি নাগরিক—বিশেষ করে মার্কিন ও ইউরোপীয়দের আটক করে কূটনৈতিক ছাড় আদায়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে।

শুধু তাই নয়, প্রতিপক্ষকে যন্ত্রণা দেওয়া এবং বিশ্বব্যাপী শিরোনাম হওয়ার জন্যও জিম্মিদের প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে তেহরান। কখনো নগদ অর্থ, কখনো বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবারই ১৯৭৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের এ সংকট মোকাবিলা পদ্ধতিকে ‘লজ্জাজনক’ বলে সমালোচনা করেছেন। এখন তিনি নিজেই একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইরান বিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, মার্কিন ক্রুকে আটক করলে ইরান দুটি পথ বেছে নিতে পারে।

১. গোপন চুক্তি: পাইলটকে গোপনে আটকে রেখে পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড় কোনো সুবিধা আদায় করা।

২. প্রচারণা ও অপমান: পাইলটকে ক্যামেরার সামনে হাজির করে নিজেদের বিজয় প্রচার করা এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে বিশ্ববাসীর সামনে অপদস্থ করা।

ইরানের দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি উল্লেখ করে আজিজি বলেন, ‘তারা বিজয়ের বার্তা দিতে এবং ট্রাম্পকে বিব্রত করতে চাইবে।’

নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধারে মার্কিন অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মাধ্যমে আরও মার্কিন সেনা সদস্য বিপদের মুখে পড়তে পারেন।

নিখোঁজ মার্কিন ক্রুকে আটক করতে পারলে পরিণতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে এখনও ইরানি কর্মকর্তারা কিছু বলেননি।

তবে দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে কটাক্ষ করে লিখেছেন—‘টানা ৩৭ বার ইরানকে হারানোর পর, তাদের শুরু করা এই চমৎকার কৌশলহীন যুদ্ধটি এখন শাসন পরিবর্তন থেকে এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে—‘কেউ কি আমাদের পাইলটদের খুঁজে দিতে পারবেন?’—অবিশ্বাস্য অগ্রগতি!’

তবে, মার্কিন ওই ক্রু যদি শেষ পর্যন্ত ইরানের হাতে ধরা পড়েন, তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক ধাক্কা হবে, এটা অনেকটাই স্পষ্ট।

Related Articles

Latest Posts