তেহরানে ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে যাওয়া সুর

ভোরের নরম আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ঠিক সেই সময় হঠাৎ বেজে ওঠে অ্যালার্ম। প্রথমে মনে হয়েছিল, হয়তো চুরির ঘটনা। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, সেটি কেবল একটি অ্যালার্ম নয়, একটি জীবনের ভাঙনের সংকেত।

তেহরানের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ‘হোনিয়াক মিউজিক একাডেমি’র দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন হামিদরেজা আফারিদেহ ও তার স্ত্রী শেইদা এবাদাতদুস্ত। রাস্তার কাছাকাছি পৌঁছাতেই তারা দেখেন, আকাশজুড়ে ঘন ধোঁয়া, এতটাই ঘন যে সামনে এগোনোই কঠিন হয়ে পড়েছিল।

‘আমরা তখনই বুঝে যাই, ভয়াবহ কিছু একটা ঘটেছে,’ বলেন আফারিদেহ।

একটি স্বপ্নের জায়গা

মাত্র দুই বছর আগে এই সংগীত বিদ্যালয়টি গড়ে তুলেছিলেন এই দম্পতি। কিন্তু এটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই ছিল না। শিশু থেকে প্রবীণ, প্রায় ২৫০ শিক্ষার্থীর কাছে এটি ছিল শেখার জায়গা, আবার অনেকের কাছে ছিল আশ্রয়, স্বস্তি, এক ধরনের পরিবারিক অনুভূতির মিলনস্থল।

কক্ষগুলো ভরে থাকত সেতারের কোমল সুর, সন্তুরের ধ্বনি, আর অনুশীলনে ডুবে থাকা তরুণদের স্বপ্নে।

‘এটা আমাদের কাছে শুধু একটি স্কুল ছিল না, এটাই ছিল আমাদের জীবন,’ বলেন আফারিদেহ।

এক মুহূর্তেই সব শেষ

সিএনএন বলছে, ২৩ মার্চ ইসরায়েলি বিমান হামলায় ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। ভবনটিতে একটি মাতৃত্বকালীন ক্লিনিকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও ছিল। ভবনটি একটি সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত ছিল।

সৌভাগ্যজনকভাবে, তখন বিদ্যালয়ে কেউ ছিল না। যুদ্ধ শুরুর পরপরই নিরাপত্তার জন্য তারা স্কুল বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে ক্ষতি কমেনি, শুধু প্রাণহানি এড়ানো গেছে।

অনেক ঘণ্টা অপেক্ষার পর তারা ভবনে ঢোকার অনুমতি পান। চতুর্থ তলায় উঠতে উঠতে দেখেন, প্রতিটি ধাপে ধ্বংস আরও স্পষ্ট। ভেঙে পড়া সিঁড়ি, ধসে যাওয়া দেয়াল, ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ। শেষপর্যন্ত যখন নিজেদের জায়গায় পৌঁছান, তখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

‘কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই, কোনো সাউন্ড সিস্টেম নেই, এমনকি দেয়ালগুলোর শব্দনিরোধক কাঠামো পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে গেছে,’ বলেন তিনি।

সুরের জায়গায় নীরবতা

ধ্বংসস্তূপের মাঝে ছড়িয়ে ছিল ভাঙা গিটারের অংশ, লুটের (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) ছিন্নভিন্ন কাঠামো, যেন কোনো এক সময়ের স্মৃতি।

‘বিস্ফোরণের শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে, মনে হচ্ছিল এখানে কখনও কিছুই ছিলই না,’ বলেন আফারিদেহ।

যে জায়গায় প্রতিদিন সুর বাজত, সেখানে এখন কেবল নীরবতা।

শিক্ষার্থীদের হারানো ‘দ্বিতীয় বাড়ি’

এই বিদ্যালয়টি শুধু শিক্ষার্জনের জন্য নয়, অনেকের কাছে ছিল মানসিক আশ্রয়স্থল।

‘এখানে তারা নিরাপত্তা আর স্বস্তি পেত। আমাদের দুজনের একসঙ্গে কাজ করার কারণে পরিবেশটা ছিল পরিবারের মতো,’ বলেন তিনি।

এখন সেই জায়গাটি নেই। শিক্ষার্থীরা হতাশ, ভেঙে পড়েছে। কারণ তারা শুধু একটি ক্লাসরুম নয়, ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হারিয়েছে।

জীবিকার চরম সংকট

বিদ্যালয়টিতে প্রায় দুই ডজন শিক্ষক ও কর্মচারী কাজ করতেন, অনেকেই তরুণ, সদ্য পাস করা। এই হামলার পর তারা হঠাৎ করেই আয়ের উৎস হারিয়েছেন।

একটি চলমান যুদ্ধের মধ্যে, যেখানে অর্থনীতি আগে থেকেই চাপে, এই ক্ষতি তাদের জন্য আরও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হিসাবের বাইরে ক্ষতি

আফারিদেহর হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪২ হাজার ডলারের সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু এই ক্ষতি শুধু টাকার অঙ্কে মাপা যায় না। এটি ১৫ বছরের পরিশ্রম, একটি স্বপ্ন, একটি কমিউনিটির ভাঙন।

অনিশ্চিত আগামীর পথ

এখন তাদের সামনে প্রশ্ন, কীভাবে আবার শুরু করবেন?

ভবনটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে, আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নতুন জায়গা, নতুন যন্ত্রপাতি, নতুন বিনিয়োগ, সবকিছুই অনিশ্চিত।

তারা বিভিন্ন সংগঠন ও সরকারের সহায়তা চাইছেন, কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে সেই সহায়তা কবে আসবে, কেউ জানে না।

সুর কি আবার ফিরবে?

‘ইরানের হাজার বছরের সংস্কৃতি সংগীতের সঙ্গে জড়িত,’ বলেন আফারিদেহ।

সংগীতকে একমাত্র সাধনা হিসেবে নেওয়া এই দম্পতি আরও বলেন, ‘এই পরিচয় আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।’

ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তাই এক ধরনের আশা রয়ে গেছে, একদিন হয়তো আবার কোনো ঘরে বাজবে সেতার, আবার কোনো শিশুর হাতে উঠবে প্রথম বাদ্যযন্ত্র।

কিন্তু সেই দিন কবে আসবে, তা এখনো অজানা।

Related Articles

Latest Posts