আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক সংবেদনশীল অধ্যায়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের সাম্প্রতিক আফ্রিকা সফর। চীনের তীব্র বিরোধিতা উপেক্ষা করে তিনি আফ্রিকার ছোট রাষ্ট্র ইসোয়াতিনি (সাবেক সোয়াজিল্যান্ড) সফর শুরু করেছেন, যাকে ঘিরে বেইজিং ও তাইপের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে।
রয়টার্স বলছে, এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর গোপনীয়তা। সফরের বিষয়টি আগে থেকে প্রকাশ করা হয়নি; বরং তিনি সেখানে পৌঁছানোর পরই আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ অতীতে তার সফরসূচি নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। বিশেষ করে আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ার মতো ঘটনাকে তাইওয়ান সরাসরি চীনের চাপের ফল বলে মনে করে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের ইসোয়াতিনি সফরটি প্রতীকী ও কৌশলগত, দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকা মহাদেশে এটিই একমাত্র দেশ, যার সঙ্গে তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া তাইওয়ানের জন্য এই সম্পর্ক ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সফরটি দেশটির রাজা তৃতীয় এমসোয়াতির শাসনের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর।
এই সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট লাই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—তাইওয়ান একটি সার্বভৌম সত্তা এবং বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার তাদের রয়েছে। কোনো দেশ এই অধিকার সীমিত করতে পারে না।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার এই অবস্থান তাইওয়ানের দীর্ঘদিনের নীতিরই প্রতিফলন, যেখানে তারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
অন্যদিকে, চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র ও আক্রমণাত্মক। চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিরোধিতা করে আসছে।
এই সফরকে কেন্দ্র করে চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর লাই চিং-তেকে কটাক্ষ করে ‘ইঁদুরের মতো লুকিয়ে চলাফেরা করা ব্যক্তি’ বলে মন্তব্য করে, যা কূটনৈতিক ভাষায় অত্যন্ত বিরল ও কঠোর।
তাইওয়ানের পক্ষ থেকেও পাল্টা প্রতিক্রিয়া এসেছে। দেশটির মূল ভূখণ্ড বিষয়ক পরিষদ চীনের ভাষাকে অশালীন বলে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট কোথায় যাবেন, তা নির্ধারণের অধিকার কেবল তাইওয়ানের জনগণেরই রয়েছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা আবারও স্পষ্ট করেছে যে, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বাইরের কোনো চাপ মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
এই ঘটনাটি মূলত বৃহত্তর চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্বেরই একটি অংশ। চীন ‘এক চীন নীতি’র আওতায় বিশ্বকে তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না রাখতে চাপ দিয়ে আসছে। এর ফলে গত কয়েক দশকে তাইওয়ানের কূটনৈতিক মিত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসোয়াতিনির মতো একটি মিত্র দেশ তাইওয়ানের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের এই সফর কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি সার্বভৌমত্ব, কূটনৈতিক স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। চীনের কড়া প্রতিক্রিয়া এবং তাইওয়ানের দৃঢ় অবস্থান দেখিয়ে দেয়, এই দ্বন্দ্ব শিগগিরই প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় যেখানে শক্তির রাজনীতি ও কূটনৈতিক চাপ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, সেখানে তাইওয়ানের এই পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—চাপ যতই থাকুক, আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তারা লড়াই চালিয়ে যাবে।

