ট্রাম্পের হাতে যেভাবে বদলাচ্ছে ন্যাটো জোট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর বৈরি সম্পর্কের জেরে নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) গঠিত হয়। 

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতন্ত্রের বিস্তারে রাশ টেনে ধরতে ১২টি দেশ এই জোট গঠন করে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এমন—ইউরোপকে সুরক্ষিত রাখার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সরাসরি জড়িত। 

পাশাপাশি, ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো অপর কোনো সংঘাত এড়াতেও এ বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তৎকালীন মার্কিন সরকার।

তবে ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই জোট নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন। ন্যাটো জোটের ইউরোপীয় দেশগুলোকে সামরিক সুরক্ষা দেওয়ার দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি থেকে বের হয়ে আসতে চান তিনি। 

বিভিন্ন সময়ে তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। 

বর্তমানে ন্যাটোর সদস্যসংখ্যা ৩২। আগামী ৭ ও ৮ জুলাই তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ন্যাটো সম্মেলন। 

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া ন্যাটোর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়টি নিয়েই মূলত এ বছরের সম্মেলনে আলোচনা করা। 

এতে কোন দ্বিধা নেই যে আটলান্টিক মহাসাগরের উভয় পারের সদস্য দেশগুলো একটি বিষয়ে একমত—ইউরোপকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজেদের সুরক্ষা নিজেদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে। 

এভাবেই ন্যাটো জোটের রূপরেখা পালটে দিচ্ছেন ট্রাম্প। 

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ন্যাটোকে ধুয়ে দিতে একটুও কার্পণ্য করেননি ট্রাম্প। যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তখনই ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন এই বিশ্বনেতা। বিশেষত, ইরান যুদ্ধে ইউরোপকে পাশে না পেয়ে যারপরনাই চটেছেন এই সাবেক আবাসন ব্যবসায়ী। 

এমন কী, তিনি জোটের পাঁচ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখিত পারষ্পরিক প্রতিরক্ষা সনদ সব সময় মানবেন না বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওই অনুচ্ছেদমতে, জোটের কোন সদস্য বহিঃশত্রু হামলার শিকার হলে জোটের বাকি সদস্যরা ওই দেশের প্রতিরক্ষা এগিয়ে আসতে অঙ্গীকারবদ্ধ। 

শুরুতে হুমকি বা ইঙ্গিত মনে হলেও ওয়াশিংটন এখন বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে। 

ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা চায় ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের মহাদেশকে সুরক্ষা দিতে এগিয়ে আসুক। যুক্তরাষ্ট্রে এখন বিশ্বের অন্যান্য অংশে নজর দিতে বেশি আগ্রহী। 

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সামরিক কৌশল নথিতে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এখন ‘পশ্চিম গোলার্ধে’ মনোনিবেশ করতে বেশি আগ্রহী। 

গত মে মাসে হঠাৎ করেই জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন। এতে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায় বার্লিন এবং ন্যাটোর শীর্ষ নেতৃত্বও।  

পাশাপাশি, পোল্যান্ডে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত স্থগিতের কথাও জানায় দেশটি। 

তবে পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। 

তা সত্ত্বেও, পেন্টাগন তার মিত্রদের জানায়, ন্যাটো জোটের দেশগুলোতে সামরিক বাহিনী ও অস্ত্র মোতায়েনের মাত্রা কমিয়ে আনতে চায় তারা। 

সে সময়, পরবর্তী ছয় মাস ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সেনা মোতায়েনের যৌক্তিকতা যাচাই বাছাই করে দেখবে বলেও জানিয়েছিল ওয়াশিংটন। 

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি বলেন, ‘ন্যাটোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জোট হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ দ্বিগুণ করেছি আমরা। ইউরোপকে তাদের নিজেদের সুরক্ষায় নেতৃত্বও দিতে হবে। জোটটি এমনই হওয়ার কথা ছিল।’

২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরই ইউরোপের দেশগুলো সামরিক বাজেট বাড়াতে শুরু করে। তবে ট্রাম্পের চাপে এসব উদ্যোগ আরও গতিশীল হয়েছে। 

বেশ কয়েক দশক ধরে সামরিক খাতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম বিনিয়োগ করে গেছে ইউরোপের দেশগুলো। তবে এই পরিস্থিতি বদলাতে দেশগুলো গত বছরের সম্মেলনে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল নাগাদ জিডিপির পাঁচ শতাংশ করার লক্ষ্য হাতে নেয় দেশগুলো।  

ইউরোপের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কূটনীতিবিদ দাবি করেন, জোটে ‘বিপ্লব’ ঘটে গেছে। 

যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে জোটে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী দেশ হলেও ইউরোপ ও কানাডা সমন্বিতভাবে ওয়াশিংটনের বাজেট ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য হাতে নিয়েছে। 

এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় আছে জার্মানি। পাশাপাশি, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ন্যাটোর বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা ছুঁয়েছে। 

জোটের সদস্যদের মত, আজ হোক, কাল হোক, যুক্তরাষ্ট্র এই জোট থেকে পিঠটান দেবেই—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এমন কী, ট্রাম্প বিদায় নিলেও এ বিষয়টি এমনই থাকবে। 

জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ক্লদিয়া মেজর বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘এখানে শুধু ট্রাম্পের ভূমিকা আছে, বিষয়টা এমন না । এটি একটি দীর্ঘ-মেয়াদী, গঠনগত পরিবর্তন।’

‘এর রূপ বদলাতে পারে, কিন্তু এটা এড়ানোর কোনো উপায় নেই’, যোগ করেন তিনি। 

ওয়াশিংটন ‘বিদায় নিলে’ ওই শূন্যস্থান পূরণে ইউরোপ একেবারে অক্ষম নয়। 

তবে দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাস্ত্র পরিপূরণ করতে সময় লাগবে। 

বিষয়টি নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হলেও মাঠ পর্যায়ে এখনো তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। 

এখনো ইউরোপজুড়ে ৮০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন আছেন। ওয়াশিংটনের অনেক ন্যাটোপন্থি কণ্ঠ তাদেরকে সেখানেই রাখার পক্ষে আছেন। 

পাশাপাশি, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রও প্রস্তুত রাখা আছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়টিতে কোনো পরিবর্তন আনার কথা একবারও উল্লেখ করেনি। 

ন্যাটোর আঞ্চলিক সদরদপ্তরগুলোতে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বেড়েছে। 

তবে এখনো ন্যাটোর স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রে হাতেই আছে। 

অপর এক কূটনীতিবিদ বলেন, ‘ন্যাটো ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।’

এখনো কেউ ন্যাটো জোটের ‘অকাল মৃত্যু’ নিয়ে কথা বলছে না। 

যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি বিদায় নেবে বা ইউরোপীয়দের তাদের নিজেদের জোট তৈরি করে নিতে হবে—এমনটাও বলছেন না কেউই। 

তবে আঙ্কারার সম্মেলনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হবে ‘বলিষ্ঠ ন্যাটো, বলিষ্ঠ ইউরোপ’ গড়ে তোলা এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে যতটা সম্ভব সম্পৃক্ত রাখা। 

আগামীতে ইউরোপের সুরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রে থাকবে ইউক্রেন। সাম্প্রতিক সময়ে একমাত্র ইউক্রেনই সরাসরি সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে এবং মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। 

তবে আপাতত ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো বাস্তবসম্মত উপায় নেই।

Related Articles

Latest Posts