জ্বালানি সংকটে ‘এসি-আসক্ত’ সিঙ্গাপুরবাসী বিপাকে

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সিঙ্গাপুর এখন কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটছে। মাত্রাতিরিক্ত এসি ব্যবহারের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিতি থাকলেও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটি এখন সরকারি অফিসের তাপমাত্রা অন্তত ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

জ্বালানি সাশ্রয়ে নগররাষ্ট্রটি সরকারি অফিসগুলোতে এখন এলইডি লাইট এবং স্মার্ট সেন্সরের মতো বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। বিবিসির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।

জ্বালানি বাঁচাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেসব দেশের তালিকায় যুক্ত হলো সিঙ্গাপুরের নাম। থাইল্যান্ডও সম্প্রতি তাদের জনগণকে এসির তাপমাত্রা ২৬ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।

মূলত এই অঞ্চলটি তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।

১৯৯৯ সালে আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্থপতি হিসেবে পরিচিত লি কুয়ান ইউ একবার বলেছিলেন, এয়ারকন্ডিশনার ‘ক্রান্তীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে।’ এসির কারণেই বাইরের প্রচণ্ড উত্তাপ উপেক্ষা করে ঘরের ভেতর দীর্ঘ সময় কাজ করা সম্ভব হয়েছে।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমার প্রথম কাজ ছিল সরকারি কর্মচারীদের দপ্তরে এসি বসানো। সরকারি কাজের দক্ষতা বাড়াতে এটিই ছিল মূল চাবিকাঠি।’

২০১৫ সালে প্রয়াত লি কুয়ান ইউকে সিঙ্গাপুরের উত্তর-ঔপনিবেশিক রূপান্তরের স্থপতি মনে করা হয়। তার নেতৃত্বেই এক সময়ের সম্পদহীন দ্বীপটি এশিয়ার অন্যতম উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে সিঙ্গাপুরে এসি নেই এমন অফিস খুঁজে পাওয়া দায়—যদিও অনেকের মতে দেশটিতে এসির ব্যবহার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।

অফিসের তাপমাত্রা এতটাই কম রাখা হয় যে, কর্মীরা প্রায়ই সঙ্গে করে কার্ডিগান বা সোয়েটার নিয়ে আসেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য শহরের মতো এখানে খোলা আকাশের নিচে বা ফুটপাতে দোকান খুব একটা দেখা যায় না; সিঙ্গাপুরের মলগুলো প্রায় পুরোটাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।

এমনকি সিঙ্গাপুরের রাস্তায় হাঁটার সময় পথচারীরা যখন কোনো শপিং মল বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের প্রবেশপথ দিয়ে যান, তখন তারা হঠাৎ করেই একঝলক হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা অনুভব করেন।

শহরের সব বাস এবং ট্রেনও একইভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এমনকি অধিকাংশ বাড়িতেই এসি লাগানো আছে এবং সেগুলো প্রায়শই সারা রাত চালানো থাকে।

সিঙ্গাপুরের পরিবেশ মন্ত্রণালয় গত ৮ এপ্রিল জানায়, ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরকার নিজেই জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সরকারি কর্মীদের এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখতে এবং ব্যবহারের সময়সীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি বাড়ানোর ফলে প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।

কর্মীদের এসির বদলে ফ্যান ব্যবহার এবং জ্বালানি খরচ কমাতে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদেরও একই পথ অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে জ্বালানির দাম এরইমধ্যেই বেড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সামনে আরও বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে জনগণকে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।

তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটি এখনও তাদের জরুরি জ্বালানি মজুত থেকে তেল খরচ করেনি কিংবা রেশন ব্যবস্থা চালুর মতো কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের মতে, সিঙ্গাপুরের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।

উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার অন্য দেশগুলোও এখন বিকল্প সরবরাহকারী এবং জ্বালানির দাম কমানোর উপায় খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে।

ফিলিপাইন তার প্রয়োজনীয় তেলের ৯৮ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। বিদ্যুৎ বাঁচাতে দেশটি সরকারি অফিসের কর্মসপ্তাহ কমিয়ে দিয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার কমানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পেট্রোলের দাম গত কয়েক সপ্তাহে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ায় গত মার্চ মাসে ফিলিপাইন প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় জ্বালানি সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।

থাইল্যান্ডও জরুরি জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের ঘর থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। থাই জনগণকে এসির তাপমাত্রা ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখতে এবং কারপুলিং বা গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আমদানি করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। দেশটি এখন একটি বিশেষ সাশ্রয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে, যেখানে জনগণকে কম সময় ধরে গোসল করতে এবং কেবল ছুটির দিনে ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

জাপানের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিক্সের গবেষক ইচিরো কুতানি বলেছেন, ইরান যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক প্রভাবকে এশীয় সংকট হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষ করে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ সেখানে প্রচুর পেট্রোল চালিত গাড়ি এবং বহু পরিবার রান্নার জন্য সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।

কুতানি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এশিয়ার জন্য এটি একটি কঠিন শিক্ষা। এই সংকট থেকে আমাদের শিখতে হবে কীভাবে জ্বালানির ঠিকঠাক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় এবং সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা যায়।

Related Articles

Latest Posts