ইন্দোনেশিয়ার ডলারের বিনিময়মূল্য অবিশ্বাস্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। দেশটির মুদ্রাবাজারে লেগেছে আগুন।
আগ্রহী ক্রেতাদের মাত্র ১ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করতে গুণতে হচ্ছে ১৮ হাজার রুপিয়াহ।
আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রা বিনিময় হার অনুযায়ী, ১ মার্কিন ডলার পেতে খরচ হয়ও ১২২ দশমিক সাত টাকা।
প্রতিবেদন মতে, তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে মুসলিমপ্রধান দেশটিতে ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়েছে।
ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার আইনপ্রণেতারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নজরদারি বাড়ানোর একটি বিলে সম্মতি দিয়েছেন।
তবে এতে সংশ্লিষ্টরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রা রুপিয়াহকে চাঙ্গা করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যে রুপিয়াহ তীব্র চাপে পড়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপিয়াহর বিনিময় হার প্রথমবারের মতো ১৮ হাজারের সীমা অতিক্রম করে।
একই দিনে দেশটির পূঁজিবাজারে প্রায় ৪ শতাংশ দরপতন দেখা যায়।
২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বাজারমূল্যের এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার পুঁজিবাজার।
এদিকে, দেশটির পার্লামেন্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার একটি আইন সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে।
সংশোধিত আইনে পার্লামেন্ট সদস্যদের জন্য ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার কার্যক্রম মূল্যায়নের সুযোগও রাখা হয়েছে।
নতুন এই সংসদীয় তদারকি ব্যবস্থা ব্যাংক আমানতের গ্যারান্টি প্রদান ও ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা ইন্দোনেশিয়া ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন (এলপিএস) এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস অথরিটি (ওজেকে)-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া বুধবার দাবি করেন, বৈশ্বিক তেলের দাম বৃদ্ধির চাপে থাকা ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই আইন সংশোধন করা হয়েছে।
রুপিয়াহর দরপতন নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষও।
রাজধানী জাকার্তায় ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ডায়ানা মুরদিয়ানা এএফপিকে বলেন, ‘এতে বৈষম্য বাড়বে। যারা ডলারে আয় করেন এবং যারা রুপিয়াহতে আয় করেন, তাদের মধ্যে দৃশ্যমান ব্যবধান তৈরি হবে।’
৩৫ বছর বয়সী সরকারি কর্মচারী রিয়ান্দি ফেব্রি নুরচাহিয়োর মতে, সরকারের আশ্বাসগুলো ক্রমেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মকর্তারা বারবার বলছেন অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী। কিন্তু সত্যিই কি তা এতটা শক্তিশালী? ডলারের মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাইকে প্রভাবিত করছে। হয়তো শীর্ষ ধনীদের ওপর এর প্রভাব তেমন পড়ছে না।’
ব্লুমবার্গ নিউজের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রুপিয়াহর মূল্য ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। যার ফলে এটি এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ আরও তীব্র হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশ। ফলে অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্যের ধাক্কা দেশটিকে প্রবলভাবে আঘাত করেছে।
তবুও সরকার ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ তেউকু রিয়েফকি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি সরকারের ‘ব্যয়বহুল জনতুষ্টিমূলক কর্মসূচি’র কারণেও রুপিয়াহর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে বহু বিলিয়ন ডলারের স্কুলে খাবার বিতরণকর্মসূচিও রয়েছে।
এ ছাড়া ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে জাকার্তার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তেউকু বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন ও কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।’
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে গত মাসে প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো কিছু পণ্য রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা দেন।
বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়ায় এই সিদ্ধান্ত ‘সম্পদ-জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে।

