চোখের পলকে ইতিহাস: ১০.৮ সেকেন্ডে স্বাগতিকদের স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন সুকুর

যে দেশে ফুটবল নিছক কোনো খেলা নয়, বরং যাপিত জীবনের স্পন্দন— এক সময় তিনি ছিলেন সেই দেশের চোখের মণি। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সরকারের রোষানলে পড়ে সেই হাকান সুকুরই আজ যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। জন্মভূমিতে ফিরলে তাকে হয়তো বরণ করতে হবে কারাবাস কিংবা মৃত্যুদণ্ড। যুক্তরাষ্ট্রে এখন একরকম লুকিয়ে দিন পার করা এই কিংবদন্তি ফুটবলারের পায়েই রচিত হয়েছিল বিশ্বকাপের দ্রুততম গোলের কীর্তি।

তুরস্ক জাতীয় দল ও দেশটির বিখ্যাত ক্লাব গ্যালাতাসারাইয়ের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা সুকুর। ভক্তরা ভালোবেসে তাকে ডাকেন ‘বুল অব দ্য বসফরাস’। তার সহজাত গোল করার ক্ষমতা এতটাই জাদুকরী ছিল যে, গ্যালাতাসারাইয়ের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফেনারবাচে ও বেসিকতাসের কট্টর সমর্থকরাও এই দুর্ধর্ষ স্ট্রাইকারকে সমীহ করতে বাধ্য হতেন।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যৌথভাবে আয়োজিত ২০০২ সালের বিশ্বকাপটি ছিল তুরস্কের ফুটবলের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়। দীর্ঘ ৪৮ বছরের যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে ফিরেছিল তারা। এই ফেরাটা কেবল নিয়মরক্ষার অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিশ্বকে চমকে দেওয়ার এক মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। আর এই অদম্য স্বপ্নযাত্রার একজন গুরুত্বপূর্ণ কারিগর ছিলেন তাদের অধিনায়ক সুকুর।

ইউরোপিয়ান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এই তারকার পা থেকে এসেছিল মহামূল্যবান ছয়টি গোল। মনে হচ্ছিল, মূল আসরেও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে একাই গুঁড়িয়ে দেবেন তিনি। কিন্তু এশিয়ার মাটিতে পা রাখার পর তার বুটজোড়া যেন হঠাৎই নিশ্চুপ হয়ে গেল।

ফুটবল দুনিয়ায় আলোড়ন তৈরি করে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় তুরস্ক। পরাক্রমশালী ও পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ম্যাচে হৃদয়বিদারক হার পর্যন্ত মোট ছয়টি ম্যাচ খেলে ফেলেছিল তারা। এই দীর্ঘ যাত্রায় ৪৩৫ মিনিট মাঠে থেকে আটটি শট নিয়েও গোলের খাতা শূন্য ছিল সুকুরের। স্ট্রাইকার হিসেবে এমন গোলখরা নিঃসন্দেহে চরম মানসিক বিপর্যয়ের।

চারদিক থেকে ধেয়ে আসছিল সমালোচনার চাপ, কিন্তু তিনি যেন নীরবে অপেক্ষা করছিলেন নাটকীয় মুহূর্তের জন্য। অবশেষে এলো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ের দিন। দেগু স্টেডিয়ামে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামল তুরস্ক। ব্রোঞ্জ পদক জয়ের এই ম্যাচটি ছিল দুই দলের জন্য নিজেদেরকে প্রমাণ করার শেষ সুযোগ।

গ্যালারিভর্তি স্বাগতিক সমর্থকদের গগনবিদারী চিৎকারের সামনে হারানো ছন্দ ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠলেন সুকুর। চোখেমুখে ছিল নিজেকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

রেফারির ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে কিক-অফ করেছিল দক্ষিণ কোরিয়াই। নিজেদের অর্ধে বলের দখল রেখে তিনটি নিখুঁত পাসও দেওয়া হয়ে গিয়েছিল তাদের। শেষ পাসটিতে বল চলে যায় সেন্টার-ব্যাক হং মিউং-বোর পায়ে। ঠিক তখনই ক্ষণিকের জন্য মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন তিনি। আর এই ভুলের সুযোগ নিতে শিকারি ঈগলের মতো ওত পেতে ছিল তুরস্ক।

কোরিয়ান ডিফেন্ডারের পা থেকে ক্ষিপ্রগতিতে বল কেড়ে নেন দারুণ ছন্দে থাকা ফরোয়ার্ড ইলহান মানসিজ। এরপর কোনো বিলম্ব না করে বলটি বাড়িয়ে দেন ডি-বক্সের ঠিক কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অধিনায়কের দিকে। এবার আর নিশানা ভেদ করতে ভুল করেননি সুকুর। বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ধারাভাষ্যকার অবিশ্বাসে চিৎকার করে ওঠেন, ‘এলিভেন সেকেন্ডস! ইটস ওয়ান অব দ্য আর্লিয়েস্ট ওয়ার্ল্ড কাপ গোলস অব অল টাইম।’

ধারাভাষ্যকার ১১ সেকেন্ড বললেও কিন্তু ঘড়ির কাঁটায় সময়টা তখন ছিল ঠিক ১০.৮ সেকেন্ড। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই জাদুকরী মুহূর্ত স্বাগতিক দর্শকদের একদম স্তব্ধ করে দিয়েছিল। পুরো টুর্নামেন্টে দীর্ঘ এক মাসের গোলখরা কাটাতে সুকুর সময় নিলেন মাত্র কয়েক সেকেন্ড। আর এই অবিশ্বাস্য গোলের মাধ্যমেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম গোলের রেকর্ডটি নিজের করে নেন তিনি।

সুকুরের এই বিদ্যুৎগতির স্ট্রাইকের মাধ্যমে ভেঙে যায় ৪০ বছর ধরে টিকে থাকা পুরোনো নজির। ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে চেকস্লোভাকিয়ার ভাস্লাভ মাসেক কিক-অফের মাত্র ১৬ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে আগের রেকর্ডটি গড়েছিলেন। মজার বিষয় হলো, মাসেকের করা গোলের সময়ও কিক-অফ করেছিল প্রতিপক্ষ। চার দশক পর তা ভাঙার দৃশ্যটিও মিলে যায় একই বিন্দুতে।

এমন অর্জনের পর পাহাড়সম চাপ নেমে যায় সুকুরের কাঁধ থেকে। ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা সত্যিই (ব্রোঞ্জ) পদক পেতে চেয়েছিলাম, তবে আমিও গোল করতে প্রবল আগ্রহী ছিলাম। বিশ্বকাপে গোল করা খুবই বিশেষ কিছু এবং আমি এটি করতে পারছিলাম না। সবাই এ নিয়ে অনেক কথা বলছিল।’

দীর্ঘ খরার আক্ষেপ কাটিয়ে পাওয়া গোলের পরম স্বস্তির কথাগুলো তার কণ্ঠে শোনা যায় এভাবেই, ‘সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল। এটি ছিল স্বস্তির, দারুণ আনন্দের এক অনুভূতি। একটি বিশ্বকাপ গোল এবং একটি পদক নিয়ে আমি বাড়ি ফিরেছিলাম।’

স্মরণীয় ওই গোলের পর দলের আরও দুই গোলে সহায়তা করেন তিনি। তার পাস থেকে জোড়া গোল আদায় করে নেন মানসিজ। উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই শেষে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়াকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে তৃতীয় স্থান আদায় করে নেয় তুরস্ক।

এই মহানায়ক আজ নিজ দেশে ব্রাত্য হতে পারেন, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে সুকুরের ১০.৮ সেকেন্ডের সেই গোল ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে এখনও অম্লান।

Related Articles

Latest Posts