বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়, এটি বয়ান বা ন্যারেটিভেরও লড়াই। এই বাস্তবতায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সাম্প্রতিক একটি উদ্যোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জোটটি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র ও টিভি নির্মাতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে, যা অনেকের কাছে স্বাভাবিক কূটনৈতিক যোগাযোগ হলেও, অন্যদের কাছে এটি ‘নরম প্রোপাগান্ডা’ তৈরির কৌশল বলে মনে হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লস অ্যাঞ্জেলেস, ব্রাসেলস ও প্যারিসে ইতোমধ্যে কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং লন্ডনেও এমন একটি বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজকেরা, অর্থাৎ যারা ভবিষ্যতের গল্প তৈরি করেন এবং কোটি মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেন।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকগুলো হচ্ছে তথাকথিত চ্যাথাম হাউস রুলের আওতায়, যেখানে আলোচনার বিষয় ব্যবহার করা গেলেও অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় প্রকাশ করা যায় না। এই গোপনীয়তা প্রথম থেকেই সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
নাটো-সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হলো নির্মাতাদের কাছে বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতা তুলে ধরা। ইউরোপে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জোট রাজনীতির পরিবর্তন—এসব বিষয় যেন চলচ্চিত্র ও টিভির গল্পে আরও বাস্তবসম্মতভাবে প্রতিফলিত হয়, সেটিই তাদের লক্ষ্য।
তাদের মতে, যদি কোনো গল্পে সহযোগিতা, পারস্পরিক সমর্থন ও জোটের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে, তবে সেটি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
কিন্তু সমালোচকদের দৃষ্টিতে বিষয়টি এত সরল নয়। আইরিশ নির্মাতা অ্যালান ও’গরম্যান এই উদ্যোগকে সরাসরি ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, নাটো চলচ্চিত্র ও টিভির মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চাইছে।
একইভাবে প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার ফয়সাল এ কোরেশি মনে করেন, এই ধরনের বৈঠক নির্মাতাদের মধ্যে এক ধরনের ‘বিশেষ জ্ঞানের অনুভূতি’ তৈরি করতে পারে, যা তাদের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে দুর্বল করে দেয়। ফলে তারা অজান্তেই এমন গল্প তৈরি করতে পারেন, যেখানে নিরাপত্তার নামে বিতর্কিত পদক্ষেপগুলোও গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
এই বিতর্কের পেছনে একটি বড় বাস্তবতা রয়েছে—জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাব। চলচ্চিত্র ও টিভি শুধু বিনোদন নয়; এগুলো মানুষের চিন্তা-ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতি ধারণা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি সিনেমা বা সিরিজের মাধ্যমে ‘কে নায়ক, কে খলনায়ক’—এই সরলীকৃত বয়ান কোটি মানুষের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে যেতে পারে। ফলে এই ক্ষেত্রটি যেকোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র বা জোটের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নাটো অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, এই বৈঠকগুলো কোনো একমুখী নির্দেশনা নয়, বরং দ্বিমুখী সংলাপ। নির্মাতারা এখানে প্রশ্ন করতে পারেন, মতামত দিতে পারেন এবং স্বাধীনভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতে পারেন। এমনকি এই উদ্যোগটি নাকি শিল্পীদের আগ্রহ থেকেই শুরু হয়েছে।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, ক্ষমতাধর একটি সামরিক জোটের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নিজেই একটি প্রভাব তৈরি করে, যা সবসময় দৃশ্যমান না হলেও কার্যকর।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি থেকেই যায়—তথ্য বিনিময় আর প্রোপাগান্ডার মধ্যে সীমারেখা কোথায়? নাটোর এই উদ্যোগ হয়তো সরাসরি প্রচারণা নয়, কিন্তু এটি যে জনপ্রিয় সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠারই প্রচেষ্টা, তা অস্বীকার করা কঠিন।
ভবিষ্যতে এই প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে নির্মাতাদের স্বাধীনতা ও দর্শকদের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
এই বাস্তবতায় বলা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে আরেকটি নীরব লড়াই চলছে—গল্পের ভেতর দিয়ে, পর্দার আড়ালে এবং সেই লড়াইয়ে কারা জয়ী হবে, তা ঠিক করে দেবে শুধু অস্ত্র নয়, বরং বয়ানও।

