১৯৫৫ সালের ৭ অক্টোবর। সান ফ্রান্সিসকোর সিক্স গ্যালারিতে অল্প কয়েকজন শ্রোতার সামনে নিজের কবিতা ‘হাওল’ প্রথমবারের মতো আবৃত্তি করেন অ্যালেন গিন্সবার্গ।
তখনো কেউ জানত না, এই কবিতাই একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করবে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘হাওল’ পরবর্তীতে বিট প্রজন্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধ প্রত্যাখ্যান করা এই বোহেমিয়ান ও অসঙ্গতিবাদী সাহিত্যিক আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করতেন গিন্সবার্গ।
কিন্তু কবিতাটি প্রকাশের দুই বছরের মধ্যেই সেটি সাহিত্য থেকে আদালতের কাঠগড়ায় চলে যায়। ১৯৫৭ সালে ‘হাওল’ বিক্রির অভিযোগে বইয়ের দোকানের মালিক লরেন্স ফেরলিংগেট্টি ও ব্যবস্থাপক শিগ মুরাওয়ের বিরুদ্ধে অশ্লীলতা মামলার বিচার শুরু হয়। সেই মামলার রায় পরবর্তী কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সাহিত্যিক সেন্সরশিপের ধারা বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৫৬ সালে সান ফ্রান্সিসকোর সিটি লাইটস বুকসে গিন্সবার্গের ‘হাওল অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম দিকে বইটির বিক্রি খুব বেশি ছিল না।
বিবিসি জানায়, কম খরচে ছাপার জন্য বইটি ইংল্যান্ডে মুদ্রণ করা হয়েছিল। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রির জন্য বইটি আমদানি করা হয়। প্রথম চালান কোনো সমস্যা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালেও ১৯৫৭ সালের মার্চে যুক্তরাজ্য থেকে আসা ৫২০টি কপি মার্কিন কাস্টমস জব্দ করে। কারণ, সেগুলোকে অশ্লীল বলে মনে করা হয়েছিল।
একজন পরিদর্শক তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না আপনার সন্তানরা এটি পড়ে ফেলুক।’
এর কয়েক মাস পর জুনে দুই পুলিশ সদস্য গোপনে ক্রেতা সেজে সিটি লাইটস থেকে বইটির একটি কপি কেনেন। এরপর বইয়ের দোকানের মালিক ফেরলিংগেট্টি ও ব্যবস্থাপক মুরাওকে গ্রেপ্তার করে অশ্লীল সাহিত্য বিক্রির অভিযোগ আনা হয়।
১১২ স্তবকের কবিতাটিতে মাদক গ্রহণ ও মানসিক অসুস্থতার স্পষ্ট বর্ণনা ছিল। এর পাশাপাশি ছিল অশালীন ভাষার ব্যবহার। ফলে রক্ষণশীল মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
‘আমেরিকান স্ক্রিম: অ্যালেন গিন্সবার্গস হাওল অ্যান্ড দ্য মেকিং অব দ্য বিট জেনারেশন’ বইয়ের লেখক জোনাহ রাসকিন বিবিসিকে বলেন, বইটি প্রকাশের সময় যুক্তরাষ্ট্রে শীতল যুদ্ধের সংস্কৃতির চূড়ান্ত পর্যায় চলছিল। সংবাদ ও তথ্যের ওপর সেন্সরশিপ, তীব্র সামাজিক একরূপতা এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে মানুষের ওপর নিপীড়ন তখন বাস্তবতা ছিল।
গিন্সবার্গ ১৯৫৫ সালের ৮ জুন ‘হাওল’ লেখা শুরু করেন। তার বন্ধু জোয়ান ভলমারের সঙ্গে স্বপ্নে কথোপকথনের পর তিনি লেখাটি শুরু করেছিলেন। ভলমারও ছিলেন বিট আন্দোলনের শুরুর দিকের একজন লেখক। ১৯৫১ সালে মেক্সিকোয় উইলিয়াম এস বারোজের গুলিতে তিনি মারা যান ভলমার।
লেখাটি প্রথমে ‘ড্রিম রেকর্ড: জুন ৮, ১৯৫৫’ নামে লেখা শুরু হয়েছিল। পরে সেটিই তিন অংশের দীর্ঘ কবিতা ‘হাওল’-এ রূপ নেয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কবিতাটিতে গিন্সবার্গ মানসিক অসুস্থতাকে একইসঙ্গে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
১৯৪৯ ও ১৯৫০ সালে চুরি করা মালামাল রাখার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন গিন্সবার্গ। এরপর একটি সমঝোতার অংশ হিসেবে তিনি আট মাস নিউইয়র্ক স্টেট সাইকিয়াট্রিক ইনস্টিটিউটে ছিলেন। তার মা এবং দীর্ঘদিনের সঙ্গী পিটার অরলভস্কিও গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছিলেন।
এই অভিজ্ঞতার ছাপ পাওয়া যায় কবিতার বহুল আলোচিত শুরুর পঙ্ক্তিতে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন,
কবিতার দ্বিতীয় অংশ লেখার সময় গিন্সবার্গ একটি ভয়াবহ মাদকজনিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। সেই সময় সান ফ্রান্সিসকোর ফ্রান্সিস ড্রেক ভবনকে তার কাছে দানবীয় মনে হয়েছিল।
তবে ‘হাওল’ শুধু মানসিক অসুস্থতা নিয়ে লেখা ছিল না। এটি ১৯৫০-এর দশকের রক্ষণশীল আমেরিকার সামাজিক রীতিনীতি ও নিপীড়নমূলক কাঠামোরও তীব্র সমালোচনা ছিল।
কবিতায় ‘মোলক’ নামের একটি প্রতীক ব্যবহার করা হয়। হিব্রু বাইবেলে উল্লেখ থাকা এক দুর্নীতিগ্রস্ত দেবতার নাম থেকে নেওয়া এই প্রতীক গিন্সবার্গের কাছে পুঁজিবাদ, সরকারি নিপীড়ন এবং সামরিক-শিল্প কাঠামোসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
কবিতাটিতে মুক্ত চিন্তা ও মাদক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলা হয়। এর ভাষা ছিল তীব্র ও চিত্রকল্প ছিল অনেকটাই পরাবাস্তব। আবৃত্তির সময় এর অনিয়মিত, জ্যাজ সংগীতের মতো ছন্দও আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছিল।
জোনাহ রাসকিনের ভাষ্য, কবিতাটির মধ্যে ‘বিদ্রোহের এক সংক্রামক শক্তি’ ছিল। এটি আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তুর দিক থেকে ছিল বিপ্লবী।
১৯৫৭ সালের ১৬ আগস্ট ফেরলিংগেট্টি ও মুরাওয়ের বিচার শুরু হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অশ্লীলতা আইনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছিল, যা তাদের পক্ষে যায়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে ‘রথ বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ মামলার রায়ে নতুন একটি মানদণ্ড তৈরি হয়েছিল। সেখানে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে সাহিত্যকর্মের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা স্বীকার করা হয়।
তবু প্রসিকিউশন দাবি করে, ‘হাওল’-এর কোনো সামাজিক মূল্য নেই, এটি কিশোর অপরাধকে উৎসাহিত করে এবং বইটি বিক্রির ক্ষেত্রে ফেরলিংগেট্টি ও মুরাওয়ের অশ্লীল উদ্দেশ্য ছিল।
আসামিপক্ষের হয়ে কাজ করে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন। প্রধান আইনজীবী ছিলেন বিখ্যাত ফৌজদারি আইনজীবী জেক এরলিখ। কবিতাটির সাহিত্যিক মূল্য প্রমাণে তিনি নয়জন বিশিষ্ট গবেষক, সমালোচক ও অধ্যাপককে আদালতে সাক্ষ্য দিতে আনেন।
বিচারের সময় গিন্সবার্গ ইউরোপ ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন। তবে তিনি ফেরলিংগেট্টির প্রতি সমর্থন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
৩ অক্টোবর বিচারক ক্লেটন হর্ন রায় দেন, ‘হাওল’ অশ্লীল নয়। তার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল, কবিতাটির ‘সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে’।
বিচারক আরও বলেন, সাহিত্যকর্মের কোনো অংশকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পুরো প্রকাশনাটিকে তার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শব্দভাণ্ডারকে যদি নিষ্প্রাণ ভদ্রভাষায় সীমাবদ্ধ করতে হয়, তাহলে সংবাদপত্র বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে কীভাবে?
রায়টির সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল ব্যাপক। গিন্সবার্গের জন্য এটি শুধু তার কবিতার স্বীকৃতি ছিল না, বরং তাকে ব্যাপক পরিচিতিও এনে দেয়।
‘হাওল অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ পরে প্রায় ১০ লাখ কপি বিক্রি হয়। এই সাফল্য গিন্সবার্গকে আরও স্বাধীনভাবে লেখার সাহস দেয়। ১৯৭৩ সালের ‘দ্য ফল অব আমেরিকা: পোয়েমস অব দিজ স্টেটস’ বইয়েও তিনি যুদ্ধবিরোধিতা ও কর্তৃত্ববিরোধী বিষয় নিয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন।
তার সহযাত্রী বিট লেখক উইলিয়াম এস বারোজ ও জ্যাক কেরুয়াকও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাদের লেখায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আধ্যাত্মিক জাগরণের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়।
‘বিটডম’ সাময়িকীর লেখক ও সম্পাদক ডেভিড এস উইলসের মতে, ‘হাওল’-এর বিচার এত আলোচিত না হলে বিট প্রজন্মও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারত না।
তবে এর চেয়েও বড় প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে। উইলসের মতে, বিচারক হর্নের রায় ছিল এমন একটি বাঁকবদলের মুহূর্ত, যার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে।
পরবর্তী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে আগে নিষিদ্ধ থাকা বেশ কয়েকটি বই আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হয়। এর মধ্যে ছিল ডিএইচ লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ এবং হেনরি মিলারের ‘ট্রপিক অব ক্যানসার’।
প্রকাশকেরাও এরপর আরও সাহসী হয়ে ওঠেন। ১৯৬২ সালে গ্রোভ প্রেস উইলিয়াম এস বারোজের বিতর্কিত উপন্যাস ‘নেকেড লাঞ্চ’ প্রকাশ করে।
ডেভিড উইলসের মতে, সাহিত্যিক মূল্য রয়েছে এমন যেকোনো কাজের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি তখন অনেক বেশি উদার হতে শুরু করে। ‘হাওল’ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব হতো কি না, সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান।
এই রায়ের প্রভাব হলিউডেও পড়ে। চলচ্চিত্র নির্মাতারা ‘সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ এই আইনি মানদণ্ড ব্যবহার করে চলচ্চিত্রে আগে নিষিদ্ধ থাকা বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার সুযোগ পান। এর ফলে মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশনের কঠোর ‘হেইস কোড’-এর বিধিনিষেধ এড়িয়ে আরও বিস্তৃত বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের পথও তৈরি হয়।
একটি কবিতাকে ঘিরে শুরু হওয়া সেই মামলাটি তাই শেষ পর্যন্ত শুধু অ্যালেন গিন্সবার্গ বা ‘হাওল’-এর ভাগ্যই বদলায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে সাহিত্য, শিল্প ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমানাও নতুন করে নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল।

