খুলনায় তাপদাহে বিপর্যস্ত জনজীবন, আয় কমেছে শ্রমজীবী মানুষের

চলমান তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে খুলনা অঞ্চলের জনজীবন। তীব্র গরম আরও বেশি অসহনীয় করে তুলছে লোডশেডিং।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের। প্রচণ্ড গরমে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার যশোরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। খুলনায় ছিল ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

মোংলায় ৩৭ দশমিক ৪, চুয়াডাঙ্গায় ৩৭ দশমিক ৩, সাতক্ষীরায় ৩৭ এবং কয়রায় ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়া অফিসের আজ শুক্রবার সকালের তথ্য অনুসারে, খুলনায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়েছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন খুলনার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

খুলনা নগরীতে রিকশা চালান মীর মনসুর। তার বাড়ি সাতক্ষীরার তালা উপজেলায়। তিনি বলেন, ‘৮-১০ বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছি, কিন্তু এ রকম গরম আগে দেখিনি। একজন যাত্রী নামানোর পর কিছুক্ষণ গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিতে হয়। আগের মতো যাত্রীও পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে আয় অনেক কমে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে বিকেল বা সন্ধ্যায় মানুষ বেশি বের হতো। এখন দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ হয়ে যায়। যে কারণে যাত্রী পাওয়া যায় না। আগে দিনে সাড়ে ৭০০ থেকে ৯০০ আয় হতো। গত পরশু সর্বোচ্চ ৬২০ টাকা আয় হয়েছে। এখন ৫০০ টাকা আয় করতেও কষ্ট হচ্ছে।’

এই পরিস্থিতি দীর্ঘ দিন চললে কীভাবে সংসার চালাবেন সেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন মনসুর।

নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কবির বটতলা কারিগরপাড়ায় প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ৩০-৩৫ জন নারী শ্রমিককে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করতে দেখা যায়। তাদের একজন রুকসানা পারভীন। তিনি বলেন, ‘মানুষ ছাতা নিয়ে চলাচল করছে, আর আমরা পেটের দায়ে এই রোদে কাজ করছি। কাজ না করলে খাব কী?’

তার সহকর্মী শিল্পী বেগম বলেন, ‘সারা দিন কাজ করে সাড়ে ৪০০ টাকা পাই। গরম থেকে বাঁচতে মাঝে মাঝে পাইপের পানি দিয়ে শরীর ভেজাই, স্যালাইন পানি খাই। আমাদের তো রাস্তাতেই থাকতে হয়—গরম, বৃষ্টি বা শীত—সব সময়।’

এই ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরাও আছেন। খুলনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সমৃদ্ধি স্বস্তি জানায়, তাদের স্কুল বন্ধ থাকলেও চালু আছে কোচিং।

‘দৌলতপুর থেকে বয়রা বাজারে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার পথ রিকশা বা ইজিবাইকে যেতে এই গরমে খুব কষ্ট হয়,’ বলে স্বস্তি।

অন্যদিকে, ঘন ঘন লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। দৌলতপুর এলাকার গৃহকর্মী লাখি আক্তার বলেন, ‘দিন-রাত মিলিয়ে ৮-১০ বার বিদ্যুৎ যায়। ঠিক মতো ঘুমাতে পারি না, কাজও করা যায় না।’

খানজাহান আলী রোডের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আলী আশরাফ বলেন, ‘অফিসে এসি আছে। যতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকে, ততক্ষণই স্বস্তি। বিদ্যুৎ চলে গেলে ভেতরে থাকা যায় না। বারবার এমন অবস্থায় কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ বোধ করছি।’

দক্ষিণ অঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড।

সংস্থাটির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বুধবার দুপুর ১টায় ৮১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬০৭ মেগাওয়াট। ওইদিন সন্ধ্যায় ৭৬৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬০১ মেগাওয়াট।

আর গতকাল বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ১৮২ মেগাওয়াট, দুপুর ১টায় ১৫৮ মেগাওয়াট।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগামী ২৫ বা ২৬ এপ্রিল বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।’

Related Articles

Latest Posts