সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোর কয়েকটি ‘কার্যকারিতা হারানোর পর’ আলাদাভাবে বিল আনার প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধীদল।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা খণ্ডিত সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না। পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আমাদের অবস্থান বহাল থাকবে।’
আজ বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৬ মিনিটে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
এর আগে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে গতানুগতিক সংসদ হিসেবে দেখিনি। এটা ভিন্নধর্মী একটা সংসদ ও চব্বিশের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা সংসদ। আশা ছিল, সংসদের সূচনা থেকেই আমরা একটা ফ্রেশ স্টার্ট করতে পারব দেশের জন্য, জাতির জন্য।’
‘কিন্তু সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট হওয়ার পরও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি’, বলেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, ‘গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন। এইটা যখন বাস্তবায়িত হলো না, জনগণের মধ্যে একটা আতঙ্ক, একটা অনিশ্চয়তা, একটা সন্দেহ দেখা দিলো।’
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ সংসদে আইন হিসেবে কার্যকর না করে কার্যকারিতা হারাতে দেওয়া হয়েছে।’
‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, নির্বাচন কমিশনের মূল জায়গাগুলো, যেগুলো ঠিক না হলে ফ্যাসিবাদ থেকে এই দেশ এবং সমাজ মুক্তি পাবে না, সেগুলোই বাতিল করে দেওয়া হলো’, বলেন শফিকুর রহমান।
অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি হুবহু ও ১৫টি সংশোধন করে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করেছিল। আরও ১৬টি যাচাই করে নতুন বিল হিসেবে আনার এবং সাতটি রহিত করার সুপারিশ করা হয়। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ছয় দিনে ৯১টি বিল পাস করে মোট ১২০টি অধ্যাদেশের সাংবিধানিক নিষ্পত্তি করে সংসদ। এর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর পথে ছিল।
গত ৯ এপ্রিল বিরোধীদলের আপত্তির মধ্যেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনরায় কার্যকর করা হয়। পরে সরকার নতুন আইন করার উদ্যোগ নেয়। একইভাবে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ সরাসরি আইনে পরিণত না করে নতুন বিল আনা হচ্ছে।
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদলের অংশ না নেওয়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা দেন শফিকুর রহমান। বলেন, আমরা সংবিধান সংশোধন নয়, গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংস্কার পরিষদ’ চেয়েছি।
গত ১৩ জুলাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাসের সময় গণভোটের রায় ‘বাইপাস’ করার অভিযোগ তুলে বিরোধীদল ওয়াকআউট করেছিল।
আজ সরকারি বিল উত্থাপন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শফিকুর রহমান। বলেন, আজকের দিনটা হলো বৃহস্পতিবার। আমাদের কনসেনসাস অনুযায়ী এই দিনটা হচ্ছে বেসরকারি দিবস। বেসরকারি দিবসে সরকারি বিল আসে কি না এটা আমার জানা নেই।
বিদ্যুৎ, গ্যাস, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন চেয়ে আগের চিঠির জবাব না পাওয়ার কথাও তুলে ধরেন জামায়াত আমির।
বলেন, একদিকে মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, লোডশেডিংয়ের জ্বালা, অন্যদিকে ভুতুড়ে বিল। এর কোনো সদুত্তর নাই। গ্যাসেরও তীব্র সংকট দেখা দিলো।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে এসব বিল এনে সংস্কারের মূল দাবি চাপা দেওয়া হচ্ছে। এসব কিছুতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সংসদকে ঠেলে একতরফাভাবে, একপেশে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা আশঙ্কা করছি, এর মাধ্যমে সংস্কারের যে মূল দাবি, সেটাকেই চাপা দেওয়া হয়। তো আমরা সেই চাপা দেওয়ার পক্ষে নাই।’
পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে অবস্থান বহাল রাখার কথা জানিয়ে এরপরই ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন তিনি।

