মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি হলো—বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া।
ইসলামাবাদে আলোচনা শুরুর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ছেড়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র রাজি হয়েছে’—এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও হোয়াইট হাউস এর সত্যতা অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই জব্দকৃত অর্থই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির মূল চাবিকাঠি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথ।
কিন্তু ইরানের জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ আসলে কত, কোন কোন দেশে আছে এসব সম্পদ এবং এর শুরু কখন ও কীভাবে?
ইউরো নিউজ, ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
ঠিক কত সম্পদ আটকে আছে তার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন সময়ের চুক্তি ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী—
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির পর প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ইরান ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিল, যা ২০১৮ সালে ট্রাম্প পুনরায় জব্দ করেন।
২০১৪ সালে পরমাণু ইস্যুতে অন্তর্বর্তী চুক্তির পর ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছিল ইরান।
এছাড়া ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়।
ইউরো নিউজের তথ্যমতে, ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের বড় অংশ এখনো বিভিন্ন দেশে আংশিক বা পুরোপুরি অচল অবস্থায় রয়েছে।
কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে—দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, চীন, জার্মানি, ভারত ও তুরস্ক।
এছাড়া হংকংয়ের শেল কোম্পানির মাধ্যমেও কিছু অর্থ সংরক্ষিত আছে।
ইউরো নিউজ জানায়, ঐতিহাসিকভাবে ইরানের তেলের বড় গ্রাহক হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে বড় একটি অংশ জমা আছে।
তবে সব দেশের ক্ষেত্রে একই নিয়ম নেই—কোথাও পুরোটা জব্দ, কোথাও আংশিক, কোথাও সীমিত ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের মুদ্রা (রিয়াল) ব্যাপকভাবে মূল্য হারিয়েছে। বিদেশি মুদ্রায় লেনদেনও (ইউরো, ইয়েন) প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে আমদানি–রপ্তানি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের একটি শুনানির সময় মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট স্বীকার করেছেন যে, বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানে ডলারের ঘাটতি তৈরি করেছিল।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে ইরানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬০ থেকে ৬৮%, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
ইরানের সম্পদ জব্দের ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং তা ধাপে ধাপে বেড়েছে।
পশ্চিমা-ঘেঁষা শাহ সরকারের পতন এবং একই সময়ে মার্কিন দূতাবাসে কূটনীতিকদের জিম্মি করার ঘটনার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার প্রথম ইরানের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করেন।
আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে এবং বিনিময়ে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড় পায় ইরান। তবে এর মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার সরাসরি ফেরত পায় তেহরান। বাকি অর্থের মধ্যে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার দিয়ে মার্কিন ব্যাংকগুলোকে ঋণ ও বকেয়া পরিশোধ করে ইরান। আর ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার নেদারল্যান্ডসের হেগে জমা রাখা হয় আইনি লড়াইয়ের জন্য, যা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।
পরবর্তী দশকগুলোতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক মিসাইল উন্নয়ন ও সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ে, ফলে জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণও বিশাল আকার ধারণ করে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আগের সব নিষেধাজ্ঞা পুনরায় কার্যকর করেন। এর ফলে ইরানের সম্পদ আবারও পুরোপুরি আটকে যায়।
ইরান অতীতে কয়েকবার সীমিতভাবে অর্থ ব্যবহার করতে পেরেছে। এর মধ্যে পরমাণু চুক্তির বিনিময়ে বড় অঙ্কের অর্থ মুক্ত হয়।
এরপর ২০২৩ সালে বন্দি বিনিময়ের শর্তে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংকে জব্দ থাকা ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যবহারের সুযোগ পায় ইরান। তবে মার্কিন তত্ত্বাবধানে শুধুমাত্র খাদ্য ও ওষুধ কেনার জন্য এই অর্থ ব্যবহার করতে পারত তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদে আলোচনায় এই সম্পদ মুক্তির বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান। এর পেছনে রয়েছে ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট। দেশটিতে এখন মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৬৮ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। তীব্র ডলার সংকট চলছে। তাই এই অর্থ ফেরত পাওয়া তেহরানের জন্য অনেকটা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ট্রাম্প প্রশাসন এই অর্থকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, অর্থ ছাড় দিলে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। কারণ পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে, অস্ত্র কেনা বা পরমাণু কর্মসূচিতে এই অর্থ ব্যয় করবে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কতটুকু অর্থ ছাড় দেবে এবং কোন শর্তে তা দেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও হতে পারে যুদ্ধ অবসানের অন্যতম উপায়।

