যুক্তরাষ্ট্রে ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ৬০ দিন সামরিক অভিযান চালাতে পারেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুদ্ধ শুরুর সময় কংগ্রেসের অনুমতি না নিলেও পরে যুদ্ধ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, আগামী ১ মে ইরান যুদ্ধের ৬০ দিন হবে। এই ডেডলাইনের মধ্যে ট্রাম্পকে হয় কংগ্রেসের কাছ থেকে নতুন সামরিক অভিযানের অনুমোদন নিতে হবে অথবা আইনত মার্কিন বাহিনীকে ওই অঞ্চল থেকে প্রত্যাহার বা অভিযান বন্ধ করতে হবে।
তবে বাস্তবে ঠিক কী ঘটবে, তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।
প্রশ্ন উঠেছে, ১ মে’র পর কি ট্রাম্প থামবেন? নাকি আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন? নাকি অন্য আইনের আশ্রয় নেবেন?
আজ শনিবার সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে উঠে আসে যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত আইন সংক্রান্ত বিষয়, ট্রাম্প কী করেছেন ও কী করতে পারেন এবং অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা কীভাবে আইন এড়িয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন তার বিস্তারিত।
১৯৭৩ সালে প্রণীত এই আইনটি মূলত প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক ক্ষমতা সীমিত করতে তৈরি করা হয়। অঘোষিত যুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি সুনির্দিষ্ট সময়রেখা নির্ধারণ করে দেয়।
আইন অনুযায়ী, কোনো সংঘাতে সেনা মোতায়েনের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসকে অবহিত করতে হবে এবং এর পরিধি, যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য সময়সীমা ব্যাখ্যা করতে হয়।
৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালাতে চাইলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। তা না হলে প্রেসিডেন্টকে সামরিক কার্যক্রম সীমিত করতে হবে।
আইন অনুযায়ী, কংগ্রেস চাইলে ৩০ দিন অতিরিক্ত সময় দিতে পারে অথবা দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন দিতে পারে।
অনুমোদনের জন্য প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যৌথ প্রস্তাব হিসেবে পাস হতে হয়।
কলোরাডো ল স্কুলের আইন অধ্যাপক মারিয়াম জামশিদি বলেন, ৬০ দিন পর আরও ৩০ দিন বাড়াতে চাইলে প্রেসিডেন্টকে লিখিতভাবে জানাতে হবে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা কতখানি বা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে বাস্তবে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করতে পারে—এমন কোনো স্পষ্ট আইনি পথ নেই।
ইরানের বিষয়ে কংগ্রেসকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে ট্রাম্প অন্যান্য প্রেসিডেন্টদের মতোই বলেছেন, তিনি সংবিধানে থাকা প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমতাবলে সেনা মোতায়েন করেছেন।
ইরান যুদ্ধ শুরুর ৬০ দিন পার হতে আর বেশি দেরি নেই। এ অবস্থায় আইন অনুযায়ী যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে হলে ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমোদন না নিলে, আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প যদি যুক্তি দেখান যে সেনা প্রত্যাহারের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, তাহলে আরও ৩০ দিন সময় পেতে পারেন তিনি।
যদিও ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য কোনো ‘খারাপ চুক্তি’ করতে তিনি তাড়াহুড়ো করবেন না।
ইরান যুদ্ধের ৬০ দিনের ‘ডেডলাইন’ ঠিক কবে, তা নিয়ে কংগ্রেসে বিভ্রান্তি রয়েছে। কারণ উভয় দলের আইনজীবীরা এই ফেডারেল আইনটিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন।
অনেকে মনে করেন, এই সময় গণনা শুরু হয়েছে শত্রুতা শুরুর দিন থেকে। সে অনুযায়ী ৬০ দিনের সময়সীমা ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত।
আবার কেউ বলছেন, হোয়াইট হাউস যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে অবহিত করেছে সেদিন থেকে ৬০ দিন গণনা করতে হবে।
তবে অনেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মনে করেন, যুদ্ধবিরতির সময়কাল এই ৬০ দিনের মধ্যে গণনা করা উচিত নয়। কয়েকজন ডেমোক্র্যাটও বলেছেন, যুদ্ধবিরতি এই সময়রেখাকে জটিল করে তুলতে পারে।
আইনপ্রণেতারা যেকোনো সময় প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ক্ষমতা বাতিল করতে পারেন, কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের এমন প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত সবসময় ব্যর্থ হয়েছে।
একাধিক প্রেসিডেন্ট, এমনকি ট্রাম্প নিজেও যুক্তি দিয়েছেন যে এই আইনটি অসংবিধানিক। যখন প্রথম এই আইন পাস হয় তখন ভেটো দিয়েছিলেন রিচার্ড নিক্সন, কিন্তু কংগ্রেস তা অগ্রাহ্য করে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এটাকে ভুয়া ও অসংবিধানিক আইন বলেছেন। বৈদেশিক নীতি পরিচালনায় এর কোনো প্রভাব নেই বলে মনে করেন তিনি।
আদালতের অনাগ্রহ এবং প্রশাসনিক কৌশলের কারণে এই আইনটি আজ পর্যন্ত কোনো সামরিক অভিযান বন্ধে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়নি।
১৯৮৩ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান কংগ্রেসে সাংবিধানিক সংঘাত এড়াতে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন।
লেবাননে মার্কিন মেরিন সেনা নিহতের পর তিনি ‘আক্রমণাত্মক আত্মরক্ষা’র কথা বলে কংগ্রেসকে অবহিত করেন এবং আইনপ্রণেতারা বৈরুতে ১৮ মাসের জন্য সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দিতে রাজি হন।
যদিও কংগ্রেসের এ অনুমোদনের কয়েকদিন পর বৈরুতে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২৪১ মেরিন সেনা ও অন্যান্য সামরিক সদস্য নিহত হলে লেবানন থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হয়।
২০১১ সালে লিবিয়ায় ড্রোন অভিযানের সময় ন্যাটোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত রাখতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও আইনটি উপেক্ষা করেন।
তার যুক্তি ছিল, ড্রোন হামলার মাধ্যমে চালিত এই অভিযানে মার্কিন সেনারা সরাসরি ‘শত্রুতা’র মুখে নেই, তাই আইনটি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
১৯৯৯ সালে কসোভোতে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে ৬০ দিনের বেশি সেনা রেখেছিলেন বিল ক্লিনটন। তার যুক্তি ছিল, কংগ্রেস যেহেতু এই মোতায়েনের জন্য অর্থ বা তহবিল অনুমোদন করেছে, তাই এটি প্রকারান্তরে অনুমতিরই শামিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কংগ্রেস থেকে অনুমোদন পাওয়া নিশ্চিত নয়। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভাজন গভীর।
এর আগে, গত ১৫ এপ্রিল সিনেটে ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার একটি দ্বিদলীয় প্রস্তাব ৫২-৪৭ ভোটে পরাজিত হয়।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে বিলিয়ন ডলার খরচ হওয়া একটি যুদ্ধে কোনো তদারকি না করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।’
রিপাবলিকানরাও আপাতত প্রেসিডেন্টকে বাধা দেয়নি, তবে অনেকেই বলেছেন ৬০ দিনের পর অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপকে সমর্থন করি। কিন্তু ৬০ দিনের বেশি যুদ্ধ চললে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া তা সমর্থন করব না।’
অনেকে যুদ্ধে সমর্থন দিলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়েও অনেকের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রান্সউইকের বোডোইন কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক সালার মোহেনদেসি বলেন, ‘এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ জনমত এর বিপক্ষে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্পের ব্র্যান্ডই হলো জয়। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভালো চুক্তি করবেন এবং যুদ্ধে জড়াবেন না। এখন তিনি এমন এক সময়ে আছেন, যখন সামনে নির্বাচন এবং যুদ্ধ।’
তার মতে, ট্রাম্প চাইলে এখানেই থামতে পারেন, কিন্তু সেটি পরাজয় মেনে নেওয়ার মতো হবে।
‘তিনি একজন জুয়াড়ির মতো। তাই হয়তো আরও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, কোনোভাবে জয়ের আশা নিয়ে,’ বলেন মোহানদেসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তাত্ত্বিকভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন বলতে পারেন যেহেতু যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তাই শত্রুতা শেষ হয়ে গেছে এবং সময় গণনা পুনরায় শুরু করা উচিত।
অথবা তিনি যুক্তি দিতে পারেন যে আইনটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
তবে ট্রাম্প যদি কংগ্রেসের এই আইনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন, তবে আদালত হস্তক্ষেপ করবে কি না, বা রিপাবলিকানরা নিজ দলের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে বা সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি আইন রয়েছে।
‘অথরাইজেশন ফর ইউজ অব মিলিটারি ফোর্স’—নামে এই আইন নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দেয়।
২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর এটি প্রথম পাস হয় এবং ২০০২ সালে ইরাকে হামলার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে মার্কিন প্রশাসন বিভিন্ন সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে এই আইন ব্যবহার করেছে।
ট্রাম্প নিজেও ২০২০ সালে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দিতে এই আইন ব্যবহার করেছিলেন।

