ভোর হলেই শতবর্ষী খেচাই খেয়াংকে ঘিরে ধরে পাড়ার শিশুরা। কেউ হাত ধরে টানে, কেউ দুষ্টুমি করে। বয়সের ভারে বিছানা থেকে উঠতেও অন্যের সহায়তা লাগে তার। অথচ শিশুদের সঙ্গে এই সময়টুকুই যেন তার জীবনের আনন্দ।
খেচাই খেয়াংয়ের ছেলে চিংগ্য খেয়াং (৬৪) বলেন, ‘বাবার বয়স এখন ১০০ বছর। স্বভাব-আচরণ অনেকটাই শিশুর মতো। ভোর হলেই শিশুরা তাকে ঘিরে ধরে। কখনো খেলায় মেতে ওঠেন, আবার কখনো পূর্বপুরুষদের ইতিহাস মনে করেন। এভাবেই চলছে তার দিনকাল।’
চিংগ্যর মা প্রায় ৯০ বছর বয়সী। তিনি এখনো নিজের কাজ নিজে করতে পারেন। কিন্তু তার বাবা সহযোগিতা ছাড়া বিছানা থেকে উঠতে পারেন না।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোতে এমনই এক বাস্তবতার মধ্যে দিন কাটছে খেয়াং, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমা সম্প্রদায়ের বহু পরিবারের।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের অনেকের কাছে রাষ্ট্রের মৌলিক সেবা এখনো অধরা। নেই পাকা রাস্তা, নেই পাড়া পর্যায়ে সরকারি স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। অসুস্থ মানুষকে কয়েক কিলোমিটার কাঁধে করে বাজারে নামাতে হয়। শিশুদের পড়াশোনার জন্য দূরের মিশনারি আবাসিকে থাকতে হয়। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বয়স্কদের চিকিৎসার জন্যও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস সামনে রেখে সরেজমিনে ধোপাছড়ির ইউনিয়নে বিভিন্ন আদিবাসীর পাড়া ঘুরে উঠে এসেছে এই বাস্তবতা।
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে খেয়াংদের তিনটি পাড়া আছে। ২ নম্বর ওয়ার্ডের গুংগুরু পশ্চিম পাড়ায় ১০০টি, কওছড়া পাড়ায় নয় এবং সম্বনিয়া পাড়ায় ১৪টি পরিবার বসবাস করে।
৪ নম্বর ওয়ার্ডে খেয়াং, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বসতি আছে।
মংলামুখ পাড়ার অংসাউ খেয়াং (৪৬) জানান, তাদের পরিবার ব্রিটিশ শাসনেরও আগে থেকে এই অঞ্চলে বসবাস করছে। তার তিন কানি ধানের জমি আছে, পাশাপাশি জুম চাষ করেন।
‘আমার বাবা বলতেন, তিনি ব্রিটিশ শাসনের সময় আট বছর বয়সী ছিলেন। সেই হিসাবে আমরা অন্তত তিন প্রজন্ম ধরে এখানে আছি,’ বলেন তিনি।
চিংগ্য খেয়াংয়ের পরিবার জানায়, খেয়াং বিল ও মংলা বিল এলাকায় তাদের পূর্বপুরুষদের ভোগদখলীয় প্রায় ২৩২ কানি ধানের জমি ছিল। ১৯৮৫ সালে তার দাদা মংসা খেয়াং মারা যাওয়ার পর গাছবাড়িয়া ও বরকল এলাকার কয়েকজন বাঙালি বন্দোবস্তের কাগজ দেখিয়ে এসব জমির মালিকানা দাবি করেন।
চিংগ্য বলেন, ‘এরপর আমরা আর জমিগুলোতে চাষ করতে পারিনি। পরে রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতরে চলে আসি। এখন চোখের সামনে আমাদের এতদিনের জমিতে অন্যরা চাষ করছে, তাই কষ্ট হয়। কিন্তু কী করার আছে?’
এখন বন বিভাগের ফরেস্টারদের বার্ষিক টাকা দিয়ে জুম চাষ করেন তারা। পাশাপাশি কলা, লেবু, আম ও আনারসের বাগান করে চন্দনাইশ, দোহাজারী, কেরানীহাট, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির বাঙ্গালহালিয়া বাজারে বিক্রি করেন।
পাড়ার ওপরে পাড়াবাসীর উদ্যোগে বাঁশ-কাঠ দিয়ে নির্মিত একটি বৌদ্ধ বিহার থাকলেও সরকারি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই।
গুংগুরু খেয়াং পাড়ার নারী উদ্যোক্তা হ্লাক্রইং খেয়ায়ের উদ্যোগে ২০২১ সালে ‘খেচাই টি মেনাই প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আশপাশের খেয়াং, ত্রিপুরা ও বাঙালি শিশুরা পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে।
তবে ধোপাছড়ি ত্রিপুরা পাড়ার প্রায় ৭০ পরিবারের শিশুদের অনেকেই কারিতাস ও ক্যাথলিক চার্চের সহযোগিতায় দেশের বিভিন্ন মিশনারি আবাসিকে থেকে পড়াশোনা করছে। এই দুর্গম জনপদের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী চন্দ্রমহন ত্রিপুরা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।
পাড়ার ছোট একটি টংঘরে চা-বিস্কুট বিক্রি করেন সুজন ত্রিপুরা (৪৩)। তার দুই পা অচল। ২০১৬ সালে জুম কাটার সময় গাছ পড়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর কক্সবাজারের মালুমঘাট খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়। কোমরের নিচের অংশও অবশ হয়ে যায়।
হুইলচেয়ারে বসে বাম হাত দিয়ে চেয়ার টেনে ক্রেতাদের চা দিচ্ছিলেন তিনি।
এদিকে আদিবাসী পরিবারগুলোর সঙ্গে প্রায় ৭০ বছর ধরে বসবাস করছেন মো. ইসলাম মিয়া (প্রায় ৯০), এক বাঙালি পরিবারের সদস্য। তার ছেলে মো. সেলিম বলেন, তার বাবা তিনবার স্ট্রোক করেছেন।
‘অসুস্থ অবস্থায় বাবাকে কাপড়ে পেঁচিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার কাঁধে করে ধোপাছড়ি বাজারের ফার্মেসিতে নিয়ে যেতে হয়েছিল,’ বলেন সেলিম।
তিনি বলেন, ‘এখানে রাস্তা নেই, ক্লিনিক নেই, চিকিৎসাসেবা নেই। অসুস্থ শিশু, অন্তঃস্বত্ত্বা নারী ও বৃদ্ধরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। আমার বাবা এখনো বয়স্ক ভাতাও পাননি।’
ধোপাছড়ির লেমুঝিড়ি ত্রিপুরা পাড়ায় ৩০টি, ইমানুয়েল ত্রিপুরা পাড়ায় ১৪টি এবং তিনটি চাকমা পাড়ায়ও কয়েকশ পরিবার বসবাস করে।
স্থানীয়দের দাবি, অফিসিয়াল কাজে চন্দনাইশ উপজেলায় যেতে একবার মোটরসাইকেলসহ জনপ্রতি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
ধোপাছড়ি বিক্রমপুর ত্রিপুরা পাড়ার কারবারি রৌছোলা ত্রিপুরা বলেন, ১৯৮৮ সালে বিলাইছড়ির রাইংক্ষ্যং পুকুর এলাকা থেকে শতাধিক ত্রিপুরা পরিবার এখানে বসতি স্থাপন করে।
তখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, মৌজা সীমানা নির্ধারণ এবং প্রত্যেক পরিবারকে পাঁচ একর জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
‘১৯৯৬ সালে হেডম্যান বিক্রম মনি ত্রিপুরা বন্যহাতির আক্রমণে মারা যাওয়ার পর আর কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি,’ বলেন রৌছোলা।
তবে তার কথায় বেঁচে থাকার দৃঢ়তাও আছে। ‘বিলাইছড়ির তুলনায় এখানে ভালো আছি। নিজে পরিশ্রম করলে খাবার পাওয়া যায়, না করলে পাওয়া যায় না।’
ধোপাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লতিফা আক্তার বলেন, ‘২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ছয়-সাতটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পাড়া আছে। এসব পাড়া রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতরে হওয়ায় স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনে বন বিভাগের অনুমতি প্রয়োজন।’
চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ইউনিয়নে ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি হাইস্কুল ও একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ক্লিনিক আছে। তবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পাড়াগুলো দুর্গম হওয়ায় সেখানে যাওয়া কঠিন।
পূর্বপুরুষের জমি বেদখল বা বন্দোবস্ত নিয়ে কোনো অভিযোগ পেয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ধোপাছড়ির অনেক মানুষই আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের কথাই জানেন না। তাদের কাছে দিবস পালনের চেয়ে জরুরি একটি পাকা রাস্তা, সরকারি স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নিরাপদ যাতায়াত এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
পাহাড়ের নীরব এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা তাই খুব সাধারণ। করুণা নয়, তারা চান রাষ্ট্রের মৌলিক সেবায় সমান অধিকার ও উন্নয়নের অংশীদারত্ব।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যদি একজন অসুস্থ মানুষকে চার কিলোমিটার কাঁধে করে বাজারে নিতে হয়, তবে প্রশ্নটি শুধু দুর্গমতার নয়, প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয় সেবা ও নাগরিক অধিকার পাওয়ার।

