গত কয়েক সপ্তাহে কম্বোডিয়ার বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টার থেকে শত শত বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব স্ক্যাম সেন্টার থেকে যারা ফিরেছেন তাদের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। প্রথমে উচ্চ বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে তাদের সেখানে নেওয়া হয়। এরপর পাসপোর্ট ও কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে সাইবার প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশি বয়স্ক মানুষদের ঠকানোর কাজে বাধ্য করা হয়।
তারা এমন একটি মানবপাচার চক্রের কথা জানিয়েছে, যারা ভুয়া চাকরির ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশিদের কম্বোডিয়ায় পাঠিয়ে সেখানে বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতিমধ্যে কম্বোডিয়ার বোকোর পর্বত বা সিহানুকভিলের এরকম বেশ কয়েকটি সেন্টার চিহ্নিত করেছে।
কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে গিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি
সিরাজগঞ্জের তোফায়েল আহমেদ (২৬) স্নাতক শেষ করে একটি ওষুধ কোম্পানিতে কাজের পাশাপাশি ইনস্যুরেন্সের পলিসি বিক্রির কাজ করতেন। কিন্তু আয় পর্যাপ্ত না হওয়ায় তিনি বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বন্ধু ও দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে কীভাবে তিনি কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা নিজেই জানিয়েছেন তোফায়েল:
তিনি বলেন, ‘আমি পরিবারের সঙ্গে একটু রাগ করে ঢাকায় চলে আসি। এরপর আমার এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। সে আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আসলে আমাদের রক্তেরও সম্পর্ক। সে নিজে চীন থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে এসে ঢাকায় একটি কোম্পানিতে কাজ করে।’
‘আমি বন্ধুকে বললাম, আমাকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা কর। আমি সৌদি আরবে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে বলল, সৌদি আরবে গেলে অনেক সময় লাগবে, ঝামেলাও আছে। কম্বোডিয়ায় খুব দ্রুত কাজের ব্যবস্থা করা যাবে। সে ঢাকায় আমাকে এক দালালের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।’
‘বিমানবন্দরের কাছে একটি চায়ের স্টলে বসে ওই দালালের সঙ্গে কথা হয়। সে আমার পাসপোর্ট স্ক্যান করে নেয়। আমাকে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এর জন্য তিনি সাত লাখ টাকা দাবি করেন। আমি তাকে এক লাখ টাকা দেই। বাকি টাকা দেই ফকিরাপুলের “পুষ্পিতা ওভারসিজ” নামের একটি এজেন্সিকে।’
তোফায়েল জানান, কয়েক সপ্তাহ পর ওই দালাল তাকে ভিসা এনে দেন।
ভিসায় জালিয়াতি ও বিমানবন্দরে হয়রানি
তিনি বলেন, ‘আমাকে কম্বোডিয়ার যে ভিসা দেওয়া হয়, তাতে আমাকে “কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার” বা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে দেখানো হয়। ইনভাইটেশন লেটারটিও ছিল “নর্থ এশিয়ান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাকে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কেন দেখানো হলো? তারা কোনো সদুত্তর না দিয়ে জানায় যে সেখানে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘২০২৫ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে আমি একা কম্বোডিয়ার উদ্দেশে রওনা দিই। এয়ারপোর্টে চেক-ইন করার সময় আমাকে বলা হয়, ব্যাংককে ট্রানজিট থাকায় আমার থাইল্যান্ডের ট্রানজিট ভিসা লাগবে। তখন আমি দালালকে ফোন করি। সে আমাকে একটি নির্দিষ্ট পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠাতে বলে। ছবি পাঠানোর ১০ মিনিটের মধ্যে এক লোক এসে আমাকে বোর্ডিং পাস করিয়ে দেয়।’
‘ইমিগ্রেশনে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, কী কাজে যাচ্ছি? আমি কনস্ট্রাকশন কাজের কথাই বলি। ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে শুভকামনা জানিয়ে যেতে দেন। বিমানে ওঠার আগে দালালের পাঠানো আরেক লোক আমার হাতে ২ হাজার ডলার দিয়ে যায়।’
তোফায়েল বলেন, ‘ব্যাংককে দুই ঘণ্টা ট্রানজিটের পর আমি নমপেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামি। সেখান থেকে এক বাংলাদেশি আমাকে রিসিভ করে। সে সম্ভবত হোটেলের ওয়েটার বা দালালের লোক ছিল। সে আমাকে একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে দুই দিন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ভালোই ছিল।’
‘এরপর আমাকে ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকারের কথা বলে একটি স্ক্যাম সেন্টারে নেওয়া হয়। হোটেল থেকে জায়গাটির দূরত্ব ছিল প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার রাস্তা। জায়গাটি ছিল নির্জন এক পাহাড়ি এলাকায়, আশপাশে কোনো বাড়িঘর ছিল না।’
‘স্ক্যাম সেন্টারের হাই-সিকিউরিটি গেটে পৌঁছানোর পর আমার পাহারায় থাকা ব্যক্তি ভেতরে ছবি পাঠায়। ছবি পেয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। ভেতরে যাওয়ার পরপরই আমার পাসপোর্ট এবং সঙ্গে থাকা ২ হাজার ডলার তারা কেড়ে নেয়।’
‘আমাকে যখন চারতলায় অফিসে নিয়ে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, তখন আমি বুঝতে পারি যে আমাকে স্ক্যামিং বা প্রতারণার কাজে আনা হয়েছে। আমার কাজ ছিল অনলাইনে মানুষের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে তাদের টাকা ইনভেস্ট করানো। আমি তাদের বলে দিই যে আমি এই কাজ করব না।’
‘তখন তারা আমাকে জানায় যে আমাকে ২ হাজার ডলারের বিনিময়ে কিনে আনা হয়েছে। আমি অনেক অনুরোধ করলেও তারা শোনেনি। বাংলাদেশে যারা আমাকে পাঠিয়েছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলে ইন্টারভিউ দাও, কিছুদিন অভিজ্ঞতা হোক, তারপর অন্য দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করব।’
নির্যাতন ও বন্দিজীবন
তোফায়েল বলেন, ‘আমি সেখানে এক মাস ২৭ দিন বাধ্য হয়ে কাজ করেছি। ওই বিল্ডিংয়ের দোতলায় থাকতাম আর চারতলায় ছিল অফিস। চার থেকে আটজন মিলে আমাদের এক রুমে থাকতে হতো। ঘরগুলো বেশ পরিষ্কার ও সেন্ট্রাল এসি ছিল।’
‘কখনো বাঙালি খাবার দিলেও মাঝেমধ্যে শুকরের মাংস বা এমন সব চাইনিজ খাবার দিত, যা আমরা খেতে পারি না।’
ওই জায়গার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘স্ক্যাম সেন্টারের ওই এরিয়া বা সীমানাটা অনেক বড় ছিল। একটা বিল্ডিংয়ে অনেকগুলো কোম্পানি থাকে। ভেতরে স্পা সেন্টার, সুপার মার্কেট সবই ছিল। তাই বাইরে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। জানালাগুলোও গ্রিল দিয়ে ঘেরা ছিল।’
‘কাজের একটা নির্দিষ্ট টার্গেট দেওয়া হতো। টার্গেট পূরণ করতে না পারলে বা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তারা টর্চার বা নির্যাতন করত। নির্জন একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো, হকি স্টিক দিয়ে পেটানো হতো। খাবারও বন্ধ করে দেওয়া হতো।’
মুক্তি ও দেশে ফেরা
‘আমি ২৭ দিন বিনা বেতনে কাজ করেছি। প্রথম মাসের বেতন হিসেবে আমাকে ৪৭৬ ডলার দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরের মাসের কোনো টাকা দেয়নি। আমি যেকোনো কৌশলে দেশ থেকে টাকা-পয়সা আনিয়ে ওই স্ক্যাম সেন্টার থেকে বের হয়ে আসি।’
‘বের হওয়ার পর এজেন্সির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে আমাকে গালাগাল করে, আমিও তাকে গালাগাল করি। সে আমাকে নতুন কোনো কাজের ব্যবস্থাও করে দেয়নি। নিজের যোগ্যতায় আমি অন্য একটি কাজ জোগাড় করি।’
‘অল্প কিছুদিন কাজ করার পর আমার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কম্বোডিয়ায় এক দিন ওভারস্টে হলে ১০ ডলার জরিমানা দিতে হয়। আড়াই মাসের বেশি ওভারস্টে হওয়ায় আমার অনেক জরিমানা জমে যায়। পরে জানতে পারি, বাংলাদেশিদের জরিমানা মওকুফ করা হচ্ছে। আমি আবেদন করার ২৪ দিন পর আমার জরিমানা মওকুফ হয়।’
‘তখন আমি আবার দেশ থেকে ৮২ হাজার টাকা আনিয়ে ফ্লাইটের টিকিট কাটি। এ বছরের ১৪ জুন রাত দেড়টার দিকে আমি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করি।’
একই ফাঁদে আরেক ভিকটিম
কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর মানিকগঞ্জের তালাত মাহমুদও বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি চাকরির জন্যই সেখানে গেছেন। ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তিনি আরেকটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েন।
তোফায়েলের মতো তালাতও জানতে পারেন যে তিনি যে চাকরির জন্য টাকা দিয়েছিলেন, তার কোনো অস্তিত্বই নেই। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তারা টাকা দাবি করে। তারা আমাকে জানায় যে আমাকে ৩ হাজার ডলারে কেনা হয়েছে।’
গত বছরের নভেম্বরে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে কম্বোডিয়ায় যান তালাত। সরাসরি কোনো ফ্লাইট না থাকায় তিনি চীন হয়ে ভ্রমণ করেন। চার ঘণ্টার ট্রানজিটে একই দিন কম্বোডিয়ায় পৌঁছান।
বিমানবন্দরে দুজন বাংলাদেশি তাকে রিসিভ করেন, যাদের একজন চালক ছিলেন। তারা তাকে একটি হোটেলে নিয়ে যান এবং সেখানে তাকে দুই দিন রাখা হয়। তৃতীয় দিন তারা তাকে শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে কম্বোডিয়ান সীমান্তের কাছে চীনাদের পরিচালিত একটি কোম্পানিতে হস্তান্তর করা হয়।
সেখানে তার টাইপিং গতি ও ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা পরীক্ষার পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তিনি কাজ করতে চান কি না। তখন তিনি বাংলাদেশে তার দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দালাল তাকে সেখানে থেকে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং বলেন যে পরে আরও ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। কিন্তু তালাত দ্রুতই বুঝতে পারেন, এমনটা কখনোই হবে না।
তিনি জানান, সেখানকার খাবার ছিল খুবই নিম্নমানের। তাকে সারা রাত জেগে কাজ করতে হতো। তিনি বারবার সেখান থেকে চলে যাওয়ার কথা বলায় দালাল ধীরে ধীরে তার ফোন ও মেসেজের উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দেন।
একই সময়ে চীনা অপারেটররা তাকে আরেকটি সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকেন। তালাত জানান, তিনি প্রথম ধাপে পাস করেছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে যেতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ, অন্য বাংলাদেশিরা তাকে সতর্ক করেছিলেন যে তাকে হয়তো আরও বেশি দামে অন্য কোনো কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতে পারে।
এর পরপরই তার ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং শুধু ১০ মিনিটের জন্য তা ব্যবহার করতে দেওয়া হতো। কাজ চালিয়ে যেতে অস্বীকার করলে তাকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তালাত আরও জানান, তাকে শুধু শুকনা নুডলস দেওয়া হতো, তা-ও মাঝেমধ্যে দিনে মাত্র একবার। অনেক সময় তাকে পানিও দেওয়া হতো না। তিনি বলেন, ‘আমি এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম যে ঠিকমতো কথা বলার শক্তিটুকুও ছিল না।’
তালাতের এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া আরও কয়েকজনের বক্তব্য এবং পুলিশের মামলার কাগজপত্রের হুবহু মিল রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি কর্মী, কারখানার কর্মী বা কাস্টমার সার্ভিস কর্মী হিসেবে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দেশ ছাড়ার আগে তারা দালালকে কয়েক লাখ টাকা দেন। তবে তাদেরকে এমন ভিসা ও কাগজপত্র দেওয়া হতো, যা প্রতিশ্রুত চাকরির সঙ্গে মিলত না।
কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের বাংলাদেশি দালালরা রিসিভ করেন। অল্প সময় হোটেলে রাখার পর তাদের কড়া পাহারায় থাকা বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হতো।
তবে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তাদের মুক্তি, পাসপোর্ট ফেরত পাওয়া এবং দেশে ফিরে আসার জন্য তাদের বা পরিবারকে টাকা পাঠাতে হয়েছিল।
কম্বোডিয়া যাওয়ার রুট
গত ১ জুলাই কম্বোডিয়ার বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার হওয়া ১০৯ বাংলাদেশি একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। এই ঘটনার পর মানব পাচারের ব্যাপকতা পরিষ্কার হয়।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, গত জুন থেকে এ পর্যন্ত মোট ৫৮৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। বিএমইটির তথ্যের বরাতে ব্র্যাক জানায়, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কাজের জন্য কম্বোডিয়া গেছেন।
ফিরে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই রুটে গিয়েছিলেন। লক্ষ্মীপুর থেকে ফিরে আসা একজন ব্র্যাককে জানান, একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্র তাকে ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে কম্বোডিয়ায় কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তিনি বিএমইটির ছাড়পত্রও নিয়েছিলেন। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তিনি বুঝতে পারেন যে তার কাছে কেবল এক মাসের ভিজিট ভিসা আছে। বাংলাদেশি দালালেরা তাকে বিমানবন্দরে রিসিভ করে একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেয়। সেখানে একটি আলাদা নির্যাতন কক্ষ ছিল, ঠিক যেমনটা তোফায়েল ও তালাত জানান।
দ্য ডেইলি স্টারের পর্যালোচনা করা পুলিশের অন্তত পাঁচটি মামলার নথিতে প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, তাদের বৈধ চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল; দালালরা বিশাল অঙ্কের অর্থ চেয়েছিল এবং তারা এমন সব কাগজপত্রে বিদেশে ভ্রমণ করেছিলেন, যা অনেক সময় প্রতিশ্রুত চাকরির সঙ্গে মিলত না। শেষ পর্যন্ত তাদের সবাইকে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
প্রতারণার ভেতরের গল্প
ফরিদপুরের বাসিন্দা আল আমিন জানান, তাকে ডেটা এন্ট্রির কাজের কথা বলে এমপ্লয়মেন্ট ভিসায় কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে তার কাছে ট্যুরিস্ট ভিসা রয়েছে। একটি জায়গায় দুই-তিন দিন কাটানোর পর তাকে এবং অন্য কয়েকজনকে একটি স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘সেখানে আমাদের প্রত্যেককে ১ হাজার ৫০০ ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।’
আল আমিনের মতে, এই চক্র মূলত ভুয়া অনলাইন পরিচয়ের মাধ্যমে বয়স্ক এবং অবসরপ্রাপ্ত আমেরিকানদের নিশানা করত। তাদেরকে মেয়েদের নাম ও ছবি দিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে দেওয়া হতো। তিনি বলেন, ‘আমার কাজ ছিল শুধু একজন মেয়ের নাম ও ছবি ব্যবহার করে মানুষের ফোন নম্বর সংগ্রহ করা।’
তিনি জানান বিভিন্ন দল স্ক্যামের বিভিন্ন ধাপ পরিচালনা করত। এক দল ফোন নম্বর সংগ্রহ করত। আরেক দল টার্গেটের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলত। তৃতীয় একটি দল ঠিকানা এবং ব্যাংকিং তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য জোগাড় করত। এসব তথ্য এরপর হ্যাকারদের কাছে পাঠানো হতো, যারা ভুক্তভোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরানোর চেষ্টা করত।
তিনি অভিযোগ করেন, ভুক্তভোগীদের আস্থা অর্জনের জন্য নারীদেরও ব্যবহার করা হতো। যখন কোনো ব্যক্তি ভিডিও কল করতে চাইতেন, তখন নারীরা ওই কল ধরতেন, সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করতেন এবং আরও বেশি ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য আদায়ের চেষ্টা করতেন।
একাধিক নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে সুরক্ষিত এসব স্ক্যাম সেন্টার। এর ভেতরে খাবার, বসবাসের জায়গা এবং দোকানপাট সবই থাকায় কর্মীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আট ঘণ্টার কর্মদিবস শিগগিরই ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টার শিফটে পরিণত হয়।
আল আমিন জানান, কর্মীরা বহুতল ভবনে থাকতেন। সেখানে ছোট ছোট ঘরে একাধিক মানুষের থাকার ব্যবস্থা ছিল এবং প্রতিটি ঘরের সঙ্গে ওয়াশরুম ছিল। তিনি আরও জানান, সেখানে পাকিস্তানি, দক্ষিণ ভারতীয়, তামিল, নেপালি, ভুটানি এবং অন্যান্য দেশের অনেকেও কাজ করতেন।
আল আমিন জানান, কাজ ছেড়ে দিতে চাইলে তাকে দেড় হাজার ডলার পরিশোধ করতে বলা হয়। এর পরও, দালাল তাদের পাসপোর্ট আটকে রাখে এবং প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে আরও ৫০০ ডলার দাবি করে। তিনি বলেন, ‘সাতজন বাংলাদেশি এই পরিস্থিতিতে আটকে ছিল।’ নিজের টাকা দিয়ে দেশে ফেরার টিকিট কাটতে হয় তাদেরকে।
একই জালে আটকা নারীরাও
মাইমুনা আক্তার মিলি অভিযোগ করেন, তিনি মাসে ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিতে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার জন্য ঋণ করেছিলেন।
তিনি জানান, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর এক বাংলাদেশি তাকে রিসিভ করে চীনাদের পরিচালিত কোম্পানিতে হস্তান্তর করেন। সেখানে তার পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাকে জোর করে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
মিলি আরও অভিযোগ করেন, এমন অনেক বাংলাদেশি নারী চাকরির লোভে গিয়ে কম্বোডিয়ায় আটকা পড়ে আছেন।
‘সাইবার দাসত্ব’
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই পরিস্থিতিকে বলছেন ‘সাইবার দাসত্ব’।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এটি কেবল মানব পাচার নয়। এটি সাইবার স্ক্যাম বা সাইবার দাসত্ব।’ তিনি জানান, পাচারের শিকার এই মানুষদের অনলাইনে অন্যদের সঙ্গে প্রতারণা করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
বারবার সতর্ক করার পরও কীভাবে হাজার হাজার বাংলাদেশি কাজের জন্য কম্বোডিয়ায় গেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শরিফুল হাসান।
তিনি বলেন, ‘কেউ যখন বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স ও স্মার্ট কার্ড নিয়ে বিদেশে যান, তখন তিনি ভাবেন যে তিনি সরকারি নিয়ম মেনেই যাচ্ছেন। কিন্তু চাকরির বদলে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।’
ফিরেছেন শত শত, মামলা কম
সিআইডির মানব পাচার ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কম্বোডিয়া থেকে সম্প্রতি অনেক বাংলাদেশি ফিরলেও সে তুলনায় মামলার সংখ্যা খুবই কম।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মানুষ ফিরে আসছে, কিন্তু সেই তুলনায় মামলার সংখ্যা নগণ্য।’
তিনি জানান, কম্বোডিয়া সরকার মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসায় অবস্থানরত বিদেশিদের জরিমানা ছাড়া ফেরার সুযোগ দেওয়ায় অনেকেই দেশে আসতে পারছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার বাংলাদেশি মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসায় অবস্থান করছেন এবং অনেকেই দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাস পেয়েছেন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সিআইডি ইতিমধ্যে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং মানব পাচারের অভিযোগগুলোর তদন্ত চলছে। তবে অনেকেই আইনি ব্যবস্থায় যেতে চান না; বরং দালালের সঙ্গে আপসরফা করে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।
তিনি আরও জানান, পাচারকারীরা এখন তাদের কৌশল পাল্টেছে। বাংলাদেশ সরকার কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপ করায় কিছু পাচারকারী এখন জাল বিএমইটি কার্ড ব্যবহার করছে অথবা কর্মীদের ট্যুরিস্ট হিসেবে প্রথমে থাইল্যান্ডে পাঠিয়ে সেখান থেকে কম্বোডিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা কঠোর হওয়ার পর তারা বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে।’
তিনি বলেন, বিদেশ থেকে ভুয়া চাকরির ফাঁদে পা দেওয়া থেকে বাংলাদেশিদের রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লাওসে কাজের জন্য যাওয়া ব্যক্তিদের ভিসা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া মন্ত্রণালয় আরও কঠোর করেছে।
জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা

