ওমানকেও কেন হামলার হুমকি দিলেন ট্রাম্প?

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা থমকে আছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ওমান। এই অবস্থায় ওমানকে হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তাই প্রশ্ন উঠছে, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র কেন ওমানকেও এই সংঘাতে টেনে আনছে?

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাড়ানোর বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে ওমান।

তবে আলোচনা এগোলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতরে ওমানের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, ওয়াশিংটনের একাংশ মনে করছে, ইরানের সঙ্গে ওমান একটি পারমাণবিক চুক্তিতে মধ্যস্থতা করতে পারে, যা তেহরানের জন্য বেশি সুবিধাজনক হবে।

আবার মার্কিন প্রশাসনের অন্য একটি অংশ মনে করে, ইরানের সঙ্গে ওমানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আলোচনার জন্য বরং সুবিধাজনক। তাদের মতে, এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়েই সমঝোতার পথ তৈরি করা সম্ভব।

ট্রাম্পের দৃষ্টিতে সমস্যা হলো, ওমান এমন একটি উদ্যোগে এগোচ্ছে, যার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা হতে পারে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন উদ্বেগও রয়েছে যে ইরান-ওমানের কোনো চুক্তি শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে পারে।

অন্যদিকে ট্রাম্প চান, যুদ্ধের আগে বিশ্বের তেল ও জ্বালানি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ যে জলপথ দিয়ে যেত, সেটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হোক।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অচলাবস্থার মধ্যেই সোমবার ওমানে বোমা হামলার হুমকি দেন ট্রাম্প।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওমানের কোন কাজে ট্রাম্প ক্ষিপ্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

তবে তিনি বলেন, ওমান ভালো আচরণ করেনি এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে দেশটিকে খুব সহজেই সামলাতে পারে।

এর আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ওমান যদি পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে ‘বোমা’ হামলা চালাবে।

ওমানকে নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে যে মতভেদ আছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, প্রশাসনের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে ওমানকে দ্বিমুখী আচরণকারী দেশ হিসেবে দেখছেন। তাদের অভিযোগ, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সবচেয়ে ভালো সমঝোতা করানোর বদলে ওমান অনেকটা ইরানের পক্ষ নিচ্ছে।

তবে অন্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে ওমানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আলোচনার জন্য একটি সুবিধা। তাদের মতে, ট্রাম্প আসলে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি শেষ করতে না পারার দায় অন্যদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন।

ওমানের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ শুধু হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত সীমিত নয়।

সিএনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। এখন ওমান যদি ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে সাহায্য করে, তাহলে সেটি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ওয়াশিংটনের একটি অংশ।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা দিয়েছিলেন। সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। কিন্তু কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওমানে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্ক সিভার্স বলেন, সামরিক পদক্ষেপ না নিয়ে ওমানের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে ট্রাম্প এই হুমকি দিয়ে থাকতে পারেন।

তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ওমানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। বহু বছর ধরে মার্কিন নৌবাহিনী দেশটির বন্দরগুলো ব্যবহার করে আসছে। ফলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ওমানে বোমা হামলার পরিকল্পনা করছে, এমনটা সহজে হবে না।

তবে সিভার্স বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের সঙ্গে ওমান যে যৌথ চেষ্টা করছে, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসে স্পষ্ট হতাশা তৈরি হয়েছে।

তার মতে, ওয়াশিংটন চায় ওমান এই প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়াক এবং হরমুজ খুলতে যুক্তরাষ্ট্রই নেতৃত্ব দিতে দিক।

সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও এখনো নিরাপদ ও স্বাভাবিক হয়নি।

এদিকে ওমান ও ইরানের আলোচনা চলছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানও কঠোর হয়েছে।

সিএনবিসিকে সিভার্স বলেন, কূটনৈতিক আলোচনা অচল হয়ে পড়েছে, এমন কথা বলা যুক্তিসঙ্গত। উভয় পক্ষই এখন আরও দীর্ঘ অচলাবস্থার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সব মিলিয়ে ওমানকে নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে ওমান। আর যুক্তরাষ্ট্র চায়, হরমুজ পুরোপুরি খুলে যাক এবং এই প্রক্রিয়ায় ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব যেন আরও শক্ত না হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তির প্রশ্ন। ফলে ওমান এখন শুধু একজন মধ্যস্থতাকারী নয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হয়ে উঠেছে।

তবে হুমকিটি শেষ পর্যন্ত বাস্তব সামরিক পদক্ষেপে গড়াবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
 

Related Articles

Latest Posts