এআই কি শ্রমিকের বন্ধু হতে পারে, যা বলছেন কানাডীয় অর্থনীতিবিদ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কিছু কাজ থেকে মানুষকে সরিয়ে দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অন্য ধাপগুলোতে শ্রমিকের চাহিদাও বাড়াতে পারে। কানাডার অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-লুই আরকাঁর গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

তার মতে, বাংলাদেশে যেখানে এখনো অনেক মানুষ কম উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত, সেখানে এআই সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল সোমবার ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে মূলত প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় এআই ব্যবহারের জায়গা ঠিক করে এবং এআই ব্যবহারের ফলে শ্রমিকদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

জ্যঁ-লুই আরকাঁ বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় যে কাজগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করে, প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভবত সেসব কাজেই আগে এআই ব্যবহার করবে। এতে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বড় বাধাগুলো দূর হবে। ফলে অন্য কাজগুলোতে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে এবং সেখানে শ্রমিকের চাহিদাও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, এআই শ্রমিকের বন্ধু হতে পারে।

আরকাঁর গবেষণাটি অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমারের ‘ও-রিং’ মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই মডেল অনুযায়ী, উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় অনেকগুলো কাজ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সমস্যা হলে পুরো উৎপাদনপ্রক্রিয়াই ব্যাহত হতে পারে।

এই বিষয়টি বোঝাতে তিনি ১৯৮৬ সালের চ্যালেঞ্জার মহাকাশযান দুর্ঘটনার উদাহরণ দেন। ওই দুর্ঘটনায় তুলনামূলক কম দামের একটি ও-রিংয়ে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। সেই ত্রুটির সঙ্গে মহাকাশযানটি ধ্বংস হওয়ার ঘটনা জড়িত ছিল।

আরকাঁ তার মডেলে দেখিয়েছেন, নির্দিষ্ট কোনো কাজে ব্যর্থতার ঝুঁকি কমাতে প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করতে পারে। এতে কর্মসংস্থানের ওপর দুই ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

একটি নির্দিষ্ট কাজে এআই মানুষের চেয়ে দক্ষভাবে কাজ করতে পারলে সেখানে শ্রমিকের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। ফলে ওই কাজে কমসংখ্যক শ্রমিক বা তুলনামূলক কম দক্ষ শ্রমিক দিয়েই কাজ চালানো সম্ভব হতে পারে।

অন্যদিকে, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অন্য কাজগুলোতে এআই শ্রমিকদের কাজের সহায়ক হতে পারে। কোনো একটি বড় বাধা এআই দিয়ে দূর করা গেলে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অন্য জায়গায় থাকা শ্রমিকরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন। এতে তাদের শ্রমের চাহিদা বাড়তে পারে।

আরকাঁ বলেন, কোনো একটি কাজে এআই ব্যবহার করলে সেখানে শ্রমিকের প্রয়োজন কমতে পারে। কিন্তু অন্য কাজে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে, কারণ সেখানে এআই শ্রমিকদের কাজের সহায়ক হবে।

কর্মসংস্থানে এআইয়ের প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তির ধরন, কোন কাজে সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এআই ব্যবহারের খরচ কত, এসব বিষয়ের ওপর।

তিনি বলেন, একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এআই শ্রমবাজারে কী প্রভাব ফেলবে, তাহলে সঠিক উত্তর হলো—এটা নির্ভর করে।

তার মডেল অনুযায়ী, যেসব কাজে ভুল বা ব্যর্থতার ঝুঁকি বেশি, প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভবত সেসব কাজেই আগে এআই ব্যবহার করবে।

অর্থাৎ এআইয়ের ব্যবহার শুধু উন্নত বা উচ্চ দক্ষতার কাজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নয়। বরং যে কাজগুলো উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় বড় বাধা তৈরি করছে এবং যেগুলো ঠিক করা গেলে উৎপাদনশীলতা অনেকটা বাড়বে, প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে আগে এআই ব্যবহার করতে পারে।

এটা সেবা খাতের বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। যেমন কোড লেখা বা অনলাইনে গ্রাহকসেবা দেওয়ার মতো কাজে এআই ভুল কমাতে এবং কাজের মান বাড়াতে পারে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এআই মজুরির পার্থক্য কিছুটা কমাতেও সাহায্য করতে পারে।

ও-রিং মডেল অনুযায়ী, শ্রমিকদের দক্ষতার সামান্য পার্থক্যও উৎপাদনশীলতা ও মজুরিতে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। কারণ উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কাজগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত।

আরকাঁ বলেন, এআই উৎপাদনপ্রক্রিয়ার দুর্বল জায়গাগুলো শক্তিশালী করে এই পার্থক্য কিছুটা কমাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য ব্যবহার করে করা একটি হিসাব বলছে, গবেষণায় দেখানো এই প্রক্রিয়ার কারণে স্বল্পমেয়াদে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে।

তবে আরকাঁ বলেন, এই লাভ খুব বেশি না। এ ছাড়া এআই চালু করার খরচও কম নয়।

তার বিশ্লেষণ বলছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় কম আয়ের দেশগুলো এআই থেকে বেশি উপকৃত হতে পারে। তবে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশকে এই সুবিধা পেতে হলে কৌশল করে এআই ব্যবহার করতে হবে।

বিশেষ করে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার যেসব জায়গায় সত্যিকারের সমস্যা বা বড় বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে এআই ব্যবহার করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

আরকাঁ বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই ব্যবহারের প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণা দরকার। বাংলাদেশে এআই কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের আগ্রহের কথাও তিনি জানান।

তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারি।

Related Articles

Latest Posts