উইকেটে ‘খাপ খাইয়ে নেওয়া’: দুই বিপরীত মেরুতে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ড

মিরপুরের উইকেট মানেই এক রহস্য। কখনো মন্থর, কখনো বল থমকে আসে, আবার কখনো থাকে অসম বাউন্স। তবে সেই রহস্য যখন খোদ স্বাগতিকদের জন্যই ধাঁধা হয়ে দাঁড়ায় এবং ভিনদেশি কোনো দল এসে অবলীলায় তা জয় করে নেয়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অনভিজ্ঞদের নিয়ে গড়া নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ২৬ রানের হার তাই খাপ খাইয়ে নেওয়ার সামর্থ্যের এক কঠিন বাস্তবতা।

নিউজিল্যান্ডের সেরা ১০-১২ জন ক্রিকেটার এই দলে নেই। অথচ পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) থেকে তারকাদের উড়িয়ে এনেও শুক্রবার এই খর্বশক্তির কিউইদের কাছে হারতে হয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের দলকে। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা সফরকারীদের ৮ উইকেটে ২৪৭ রানের জবাবে ৯ বল বাকি থাকতে ২২১ রানে থামে বাংলাদেশ।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসা দুই দলের দুই সদস্য— বাংলাদেশের সাইফ হাসান ও নিউজিল্যান্ডের ডিন ফক্সক্রফটের কণ্ঠে ঝরেছে উইকেটে মানিয়ে নেওয়ার সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সুর।

মিরপুরের চেনা উইকেটে ব্যাটিং করা ‘কতটা কঠিন’ ছিল, তা ফুটে ওঠে সাইফের কথায়। হাফসেঞ্চুরি করেও দলকে জেতাতে না পারা এই টপ অর্ডার ব্যাটার উইকেট নিয়ে নিজের অস্বস্তি লুকাননি, ‘আমার মনে হয়, উইকেটটা শুরুর দিক থেকে একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু কিছু ভুল সময়ে আমাদের উইকেটগুলো পড়ছে। আমি আরেকটু ব্যাট করতে পারতাম… থিতু হওয়া ব্যাটারের জন্য একটু সহজ ছিল, নতুন ব্যাটারের জন্য একটু কঠিন ছিল। এটাই আর কী, আমাদের মানিয়ে নিতে হবে।’

পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে স্পোর্টিং উইকেট পাওয়ায় এবারও ব্যাট-বলের মধ্যে ভারসাম্য রাখা তেমন কিছুর আশা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু মিরপুর ফিরেছে তার পুরনো রূপে। সাইফ সেই প্রসঙ্গ টেনে আনেন, ‘পাকিস্তানের বিপক্ষে সবশেষ সিরিজের উইকেটে তো আপনারা দেখছেন, ট্রু উইকেট ছিল। এখানেও উইকেট ভালো ছিল, একদম খারাপ ছিল না। আমার মনে হয়, আমরা যদি খাপ খাইয়ে নেওয়ার কাজটা একটু ভালোমতো করতে পারতাম, একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে অজুহাত দেওয়ার কিছু নেই… আমাদের সেই স্কিল সেট অবশ্যই আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজকে আমরা তা করতে পারিনি।’

উইকেটে অপ্রত্যাশিত বাউন্স নিয়েও আক্ষেপ করেন তিনি, ‘একটা ধারণা ছিল যে, কী রকম হতে পারে উইকেট, তবে আজকে কিছুটা বেশি অসম বাউন্স হয়েছে। তবে আমার মনে হয়, ঐ অজুহাত দিয়ে আসলে বাঁচার কোনো উপায় নেই।’

অথচ যে উইকেটে খাবি খেয়েছে স্বাগতিকরা, ম্যাচসেরার পুরস্কারজয়ী নিউজিল্যান্ডের অলরাউন্ডার ফক্সক্রফটের কাছে সেটি ছিল ‘চমৎকার’। তার বয়ানে ফুটে ওঠে প্রস্তুতির জয়গান, ‘বাংলাদেশে খেলা আমাদের জন্য একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আমাদের দেশের উইকেট চমৎকার আর বাউন্সি হয়, যেখানে পেসাররা সুবিধা পায়। এখানকার উইকেট স্পিন-সহায়ক। তবে আজকের উইকেটটি শুরুর দিকে পেসারদের জন্যও ভালো ছিল। আমরা আগে থেকেই জানতাম ইনিংসের মাঝপথে স্পিন বড় ভূমিকা রাখবে। ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে আমরা যেভাবে খেলেছি, তাতে আমি সন্তুষ্ট। দল হিসেবে আমরা ২৪০ রান নিয়ে বেশ স্বস্তিতে ছিলাম।’

নিজেদের পরিকল্পনায় কতটা অটল ছিলেন, তা বলতে গিয়ে ব্যাট হাতে ফিফটি করা ও বল হাতে ১ উইকেট নেওয়া ফক্সক্রফট কৃতিত্ব দেন মিরপুরের অনুশীলন উইকেটকেও। যেখানে খাপ খাইয়ে নিতে স্বাগতিকরা ব্যর্থ, সেখানে কিউইরা আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন, ‘আমার মনে হয়, উইকেটটি আজ চমৎকার আচরণ করেছে। অতীতে এখানকার উইকেট কেমন হবে, তা নিয়ে আমি সব সময় একেক জনের কাছে একেক রকম কথা শুনেছি। অনুশীলনের উইকেটগুলোর সাথে মূল মাঠের উইকেটের বেশ মিল ছিল। তাই আমাদের কাজ হলো, যে ধরনের উইকেটই দেওয়া হোক না কেন, তার সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া। এ নিয়ে অভিযোগ করার কিছু নেই।’

ম্যাচের সমীকরণ বলছে, শেষ ১০ ওভারে বাংলাদেশের দরকার ছিল ৬৭ রান, হাতে ছিল ৬ উইকেট। উইকেট বিবেচনায় নিয়েও জয়ের জন্য খুব কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু মাঝের ওভারগুলোতে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটাররা যেভাবে খোলসবন্দী হয়ে পড়েন, সেখানেই ম্যাচটি ফসকে যায়। তাই ফক্সক্রফট যখন বলেন, ‘মাঝের ওভারগুলোতে পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী খেলাটাই ছিল মূল বিষয়’, তখন সাইফ বলছেন, ‘ভুল সময়ে কিছু উইকেট পড়াতে আমরা পিছিয়ে গেছি।’

সব মিলিয়ে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের কাছে এই হার বাংলাদেশের জন্য তাই কেবল রান বা উইকেটের ব্যবধান নয়, বরং বড় এক মানসিক ধাক্কাও।

Related Articles

Latest Posts