বৃহস্পতি-শুক্রবার দুদিন ধরে চলেছে ঈদুল আজহার কোরবানি। বাড়তি কিছু আয়ের আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসময় রাজধানীতে ভিড় জমান বিভিন্ন পেশার মানুষেরা। এদের অধিকাংশই ‘একদিনের কসাই’। এছাড়া রয়েছেন এ শহরের বিভিন্ন বাড়ির ব্যবস্থাপক, নিরাপত্তা কর্মী, গৃহকর্মীসহ অনেকেই।
কোরবানির অতিরিক্ত দায়িত্ব, বাড়তি কিছু আয় আর মাংস সংগ্রহের কারণে অনেকেই থেকে গেছেন ঢাকা শহরে। ঈদের দ্বিতীয় দিনে নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলো ফিরতে শুরু করেছেন নিজেদের শেকড়ে, বাড়িতে।
শুক্রবার রাজধানীর অন্যতম প্রধান বাস টার্মিনাল গাবতলীতে ছিল এমন বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল।
গাবতলী সেতুর পাশে ৩২ জনের এমন একটি দলের সঙ্গে কথা হয় দ্য ডেইলি স্টারের। প্রত্যেকেই পাবনার সাথিয়া উপজেলার বাসিন্দা। গত সোমবার তারা আসেন রাজধানীতে।
এই দলেরই একজন আল আমিন (৩৫)। পেশায় কসাই এ যুবক গত পাঁচ বছর ধরে কোরবানির ঈদের সময় ঢাকা আসেন।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘মিরপুরের রুপনগর আবাসিক এলাকায় এবার মাংস কাটার কাজ করেছি। তবে উপার্জন আগের মতো হয়নি। গতবার কাজ করে ৩০ হাজার টাকা কামাই করেছিলাম। এবার দুই দিনে আয় হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। সেটা নিয়েই বাড়ি ফিরছি।’
একই দলের কসাই ইউসুফ (৪২) আফসোস নিয়ে বলেন, ‘৭ বছর ধরে ঢাকায় আসি। এবারই সবচেয়ে কম টাকা পেলাম।’
বগুড়ার শেরপুর উপজেলা থেকে আগত ২০ জনের আরেকটি দলের দেখা মেলে সন্ধ্যার দিকে।
উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে কাজ করা দলটির এক সদস্য ফরহাদ শেখ (৩২) অভিযোগের সুরে বলেন, ‘এবার কেয়ারটেকার, দারোয়ানদের কমিশন না দিলে কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। গরুপ্রতি ১২ শতাংশ মজুরি থেকে তাদেরই কমিশন দিয়ে দিতে হয়েছে ২-৩ শতাংশ। ভাগে ৫ হাজারের বেশি টাকা পাইনি।’
বগুড়ার কসাই লাবলু মিয়া (৪০) গত ২০ বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘গতবার গরুপ্রতি মজুরি ছিল ১৫ শতাংশ। এবার পেয়েছি ১০ শতাংশ করে।’
খিলগাও-মগবাজারে কাজ করে তার দলের ৮ জনের ভাগে জুটেছে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকার মতো। সবাই মিলে এখন ধরেছেন বাড়ি ফেরার পথ।
কামরাঙ্গীরচরের রাজমিস্ত্রি রাকিবুল ইসলামও (২৯) কোরবানির সময় হয়ে যান ‘একদিনের কসাই’। তার উপার্জন হয়েছে ৩ হাজার টাকা। রাকিবুলের স্ত্রী জরিনা বেগম (২৫) ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। আগে-ভাগে ছুটি পেলেও স্বামীর জন্য এতদিন রাজধানীতেই ছিলেন।
দুজন মিলে গাবতলী এসেছেন লালমনিরহাটের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
রাকিবুল বলেন, ‘দুপুরের পরই গাবতলীতে চলে এসেছি। আমাদের বাস সন্ধ্যা ৬টায়। ঈদের সময় যেতে না পারলেও এখন বাড়ি গিয়ে আমরা ঈদ করব।’
গাবতলীজুড়ে যাত্রীর সংখ্যা কম না হলেও পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা খুব একটা খুশি নন। অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ হওয়ায় ভাড়া নিয়ে দিনভর চলেছে দর কষাকষি।
ঢাকা-বগুড়াগামী হাসান এক্সপ্রেসের চালকের সহকারী নুরুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের রুটে নিয়মিত বাসভাড়া ৭০০-৮০০ টাকা করে। তবে আজকের যাত্রীরা বাড়া দিতে চায় ৪০০ টাকা করে। শেষমেশ ৫০০ টাকায় আমরা যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করেছি।’
এভাবেই বাধা-বিপত্তি সঙ্গী করে ঈদের পর ঈদ উদযাপনে বাড়ি ফিরছেন রাজধানীর নিম্ন আয়ের মানুষেরা।

