ইরানের নিশানায় কেন আরব আমিরাত

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে এখন সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিশানা করে কড়া বার্তা দিচ্ছে ইরান। তেহরানের হুঁশিয়ারি—ওয়াশিংটন বা তেল আবিব যদি পুনরায় কোনো আগ্রাসন চালায়, তবে তার পাল্টা জবাব হিসেবে আমিরাতের ওপর নজিরবিহীন ও শক্তিশালী আঘাত হানা হবে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য আলী খেজরিয়ান চলতি সপ্তাহের শুরুতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, আমিরাতের সঙ্গে আমাদের ‘প্রতিবেশী’ সুলভ সম্পর্কের তকমা আপাতত ঘুচে গেছে। দেশটিকে এখন আমরা ‘শত্রু ঘাঁটি’ হিসেবেই দেখছি।

গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও চলতি মে মাসে হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এরপরই ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ সদর দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আমিরাতকে সরাসরি কাঠগড়ায় তোলা হয়।

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) জেনারেলদের নেতৃত্বাধীন যৌথ কমান্ড এক কড়া বার্তায় আমিরাতের নেতাদের বলেছে, তারা যেন নিজ দেশকে ‘মার্কিন-জায়নিস্টদের আস্তানা’ হতে না দেয়। এই ধরনের সামরিক সহযোগিতা মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য হবে বলেও তারা মন্তব্য করে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের ক্রমবর্ধমান সামরিক, রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক এ অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইরানের দ্বীপ বা বন্দরগুলোতে পুনরায় আঘাত হানলে এমন ‘দাঁতভাঙ্গা ও চরম অনুশোচনামূলক’ জবাব দেওয়া হবে যা আমিরাত আগে কখনো দেখেনি।

ফুজাইরাহ বন্দরকে ঘিরেও উত্তাপ বাড়িয়েছে ইরান। আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নৌ-কর্তৃত্বের মধ্যেই এই বন্দরের অবস্থান। ফলে এই রুট দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজ ইরানের আইনি এখতিয়ারের মধ্যে পড়বে। সম্প্রতি বন্দরে একটি হামলার ঘটনা ঘটলেও তাতে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে তেহরান।

অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত দফায় দফায় ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সামরিক পন্থাসহ যেকোনো উপায়ে এই হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আমিরাত সেখানে বছরের পর বছর ধরে থাকা ইরানিদের ভিসা বাতিল করেছে। একই সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইরানি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক রুট, মুদ্রা বিনিময় নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন সংস্থা।

দুই দেশের সম্পর্কের এই অবনতি ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় এক ধাক্কা। তেহরান তাদের আমদানির বড় অংশ, বিশেষ করে চীন থেকে আসা পণ্যগুলোর জন্য আমিরাতি বন্দরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।

মার্কিন নৌ-অবরোধের ফলে ইরানে খাদ্যের দাম এখন লাগামহীন। এই সংকট কাটাতে ইরানি প্রশাসন এখন সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে পাকিস্তান, ইরাক ও তুরস্কের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্য দিয়ে স্থলপথ সচল করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।

কেন ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিশানা করছে?

বছরের পর বছর ধরে আমিরাতের মাটিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে আবুধাবির উপকণ্ঠে অবস্থিত আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে কয়েক হাজার মার্কিন সৈন্য এবং অত্যাধুনিক রাডার ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম মোতায়েন রয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটিটিই তাদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল।

২০২০ সালে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’র মাধ্যমে বাহরাইন ও মরক্কোর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি তার প্রথম মেয়াদে করা এই চুক্তির পরিধি আরও বাড়াতে চান এবং বিশেষ করে সৌদি আরবকে এতে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী। তবে গাজায় ইসরায়েলের চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে এই প্রক্রিয়া আপাতত থমকে আছে।

ওপেক জোট থেকে আমিরাতকে বের করে আনার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প দেশটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানকে এক ‘চতুর নেতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, নাহিয়ান এখন আর কারও ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব কৌশলে এগোতে আগ্রহী।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সইয়ের পর থেকে ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দ্রুত বেড়েছে। এমনকি ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস’ উপসাগরীয় এই দেশটিতে তাদের একটি শাখা অফিসও খুলেছে।

চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল তাদের ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েক ডজন সৈন্য আমিরাতে পাঠিয়েছে। আরব বিশ্বের অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে ইসরায়েল এমন নজিরবিহীন পদক্ষেপ আগে কখনও নেয়নি।

গত মঙ্গলবার তেল আবিবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, অত্যাধুনিক রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন মূলত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আমিরাত-ইসরায়েল ‘অসাধারণ সম্পর্কের’ ফল।

আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ গত ১৭ মার্চ বলেন, আরব প্রতিবেশীদের ওপর ইরানের হামলা মূলত ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।

আমিরাতের দাবি, তাদের বৈদেশিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব সম্পূর্ণ একটি ‘সার্বভৌম বিষয়’। আরব দেশগুলোর ভূখণ্ড ও আকাশপথ ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে— তেহরান এমন অজুহাত তুলে বিশ্ব সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার এবং তাদের হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এ ছাড়াও গ্রেটার তুনব, লেসার তুনব এবং আবু মুসা দ্বীপ নিয়ে ইরানের সঙ্গে আমিরাতের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ১৯৭১ সাল থেকে এই দ্বীপগুলো ইরানের দখলে রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

যুদ্ধের সময় কেন ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, সে বিষয়ে গত মাসে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রিম আল-হাশিমি।

তিনি বলেন, আমরা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক; এখানে দুই শতাধিক দেশের মানুষ মিলেমিশে থাকে এবং আমরা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে লালন করি।

তিনি আরও যোগ করেন, ইরান তার যাবতীয় সম্পদ পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন-বিরোধী ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-কে সমর্থন এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পেছনে ঢেলে দিয়ে নিজেদের নিঃস্ব করে ফেলেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত কি সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়েছিল?

পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে নিবিড় সামরিক সখ্য আর বিশাল অর্থবিত্তের জোরে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন এক শক্তিশালী বিমানবাহিনীর অধিকারী। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও আধুনিক যুদ্ধবিমানে সজ্জিত এই বাহিনী এখন এ অঞ্চলের অন্যতম সেরা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পরেই ইসরায়েলি গণমাধ্যমে খবর আসে, আমিরাতের যুদ্ধবিমান ইরানের কেশম দ্বীপের একটি পানি শোধনাগারে সরাসরি বিমান হামলা চালিয়েছে।

তবে আমিরাতের শীর্ষ কর্মকর্তা আলী আল-নুয়াইমি এই দাবিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা কোনো কাজ করলে তা ঘোষণা করার মতো সাহস আমাদের আছে।

তেহরান এই হামলার পেছনে মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটকে দায়ী করে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আইআরজিসি বাহরাইনের ‘জাফায়ার’ ঘাঁটিতে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তাদের বিশ্বাস ছিল, ওই মার্কিন ঘাঁটি থেকেই ইরানের ওপর হামলাটি চালানো হয়েছিল।

এপ্রিলের গোড়ার দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘আইআরআইবি’-র একটি অনুষ্ঠানে একটি বিধ্বস্ত ড্রোনের ছবি প্রদর্শন করা হয়। দাবি করা হয়, এটি চীনের তৈরি ‘উইং লুং’ ড্রোন যা ইরান ভূপাতিত করেছে। এই মডেলের ড্রোন এর আগে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল আমিরাত।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধের সময় ইরানের মূল ভূখণ্ডে হওয়া বিভিন্ন হামলার পেছনে আমিরাতের হাত থাকতে পারে। বিশেষ করে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোর তেল স্থাপনায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য তারা আমিরাতকেই সন্দেহের তালিকায় রেখেছে।

যদিও ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমিরাতকে অভিযুক্ত করা হয়নি, তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একাধিক অনুষ্ঠানে সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকেই আঙুল তোলা হয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া এক ‘ডেডলাইন’ শেষ হওয়ার ঠিক আগে এবং যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই ইরানের লাভান তেল শোধনাগারে হামলা ও সিরিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তবে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই এই হামলায় তাদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।

ওই ঘটনার ঠিক পরেই আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলগুলোতে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হয়, সেটি আমিরাতের একটি ‘মিরাজ ২০০০-৯’ যুদ্ধবিমান, যা দক্ষিণ ইরানের আকাশে উড়ছিল।

কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র ছাড়াই ইরানের সরকারপন্থি সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার করতে থাকে যে, আমিরাতের মিরাজ বিমানগুলোই ওই হামলা চালিয়েছে।

ইরানি বিশ্লেষকরা আরও একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। গত মাসের শেষে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে যখন আমিরাতি যুদ্ধবিমান পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন দেখা যায় ওই এফ-১৬ই বিমানগুলোর গা থেকে জাতীয় পরিচয় বা ‘টেইল নাম্বার’ মুছে ফেলা হয়েছে।

ইরানিদের মতে, এটি একটি জোরালো পরোক্ষ প্রমাণ যে আমিরাত এই বিমানগুলো গোপনে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে এবং কোনোভাবে ভূপাতিত হলে বিমানের পরিচয় গোপন রাখতেই এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে।

এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান তৎক্ষণাৎ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে শুরু করে, যার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। এরপর বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবেও হামলা চালানো হয়— তবে আশ্চর্যজনকভাবে ইসরায়েলে নয়। মূলত যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের বাইরে আমিরাতকেই ইরানের পক্ষ থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে।

ইরানে হামলার বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

Related Articles

Latest Posts