ইরানের শান্তি আলোচনা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলেও পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান—এমন খবর প্রচার করে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম অ্যাক্সিওস।
পরবর্তীতে রয়টার্সসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যম বিষয়টি নিশ্চিত করে।
জানা যায়, ইরানের প্রস্তাব বিবেচনা করছেন ট্রাম্প। তবে আজ মঙ্গলবার জানা গেল, এই প্রস্তাবে খুশী নন ট্রাম্প।
ইরানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও প্রেসিডেন্ট শেহবাজ শরীফের কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনার জোরদার চেষ্টা চালাচ্ছেন ‘হঠাৎ করেই’ বৈশ্বিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়া এই দুই ব্যক্তিত্ব।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষ ‘বার্তা’ পাঠিয়েছে ইরান। তবে প্রস্তাবের আকারে পাঠানো সেই বার্তায় খুশি হতে পারেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক মার্কিন কর্মকর্তা এমনটাই জানিয়েছেন।
দুই মাসের সংঘাত বন্ধের স্পষ্ট একটি রোডম্যাপ দিয়েছে তেহরান। কোন কোন বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে না (কূটনৈতিক ভাষায়, “রেড লাইন”) সেটা তারা স্পষ্ট করেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, যুদ্ধের অবসান এবং পারস্য উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিতর্কের সমাধান না আসা পর্যন্ত ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা স্থগিত থাকবে।
স্বভাবতই, এ বিষয়টিকে ভালো ভাবে নেয়নি ওয়াশিংটন।
তাদের মত, ইরানের পরমাণু প্রকল্পের বিষয়টির সুরাহা হতে হবে সবচেয়ে আগে।
এ কারণে ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবে নাখোশ হয়েছে বলে ওই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন।
গতকাল সোমবার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে শেষ করে ট্রাম্প এই মত দেন।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস জানান, যুক্তরাষ্ট্র ‘গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে দরকষাকষি করবে না।’
‘আমরা আমাদের রেড লাইন স্পষ্ট করেছি’, যোগ করেন তিনি।
২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করেছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ। ওই চুক্তির আওতায় ইরানের পরমাণু প্রকল্পকে বড় আকারে কাটছাঁট করা হয়। ইরানের ভাষ্য, শুধু শান্তিপূর্ণ কাজেই তারা পরমাণু শক্তি ব্যবহার করছে।
তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ওই চুক্তি ভেস্তে যায়।
গত সপ্তাহে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য ট্রাম্পের দুই প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের ইসলামাবাদ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শনিবার ওই সফর বাতিল করেন ট্রাম্প।
সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দুই বার ইসলামাবাদে যান। কিন্তু সেই বহু আরাধ্য বৈঠক আর হয়নি।
পরবর্তীতে ওমান এবং রাশিয়া সফর করেন আরাঘচি।
রুশ প্রেসিডেন্ট ও দীর্ঘ দিনের মিত্র ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে ইতিবাচক বার্তা পেয়েছেন আরাঘচি।
আরাঘচি রাশিয়ায় গণমাধ্যমকে বলেন, ট্রাম্প নিজেই ইরানের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাত থেকে তাদের একটি লক্ষ্যও পূরণ করতে পারেনি।
নাম না প্রকাশের শর্তে ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেন, ইসলামাবাদে আরাঘচি যে প্রস্তাব নিয়ে গেছেন, সেখানে কয়েক ধাপে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরমাণু প্রকল্প আলোচনার পরিধির বাইরে থাকবে।
প্রথম ধাপের আলোচনায় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা বন্ধের বিষয়টি উঠে আসবে। যুক্তরাষ্ট্রকে লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে, যে তারা আবার নতুন করে হামলা শুরু করবে না। এরপরের ধাপে আলোচিত হবে ওয়াশিংটনের বন্দর অবরুদ্ধ করে ইরানের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার বিষয়টি এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ।
নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চায় ইরান।
এসব বিষয়ের সুরাহা হলেই কেবল পরমাণু প্রকল্পসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে—এমন প্রস্তাব রেখেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান দীর্ঘসময়ের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক অথবা চিরতরে এই অভিলাষ ত্যাগ করুক। বিপরীতে তেহরানের দাবি, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আছে ইরানের—এ বিষয়টি যাতে ট্রাম্প প্রশাসন মেনে নেয়।
মার্কিন কংগ্রেসের পক্ষ থেকেই নতুন ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেসের পূর্ব-অনুমোদন ছাড়া রাষ্ট্রপ্রধান সর্বোচ্চ ৬০ দিন কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সামরিক অভিযান’ চালাতে পারেন—এর বেশিদিন ধরে চললে এর জন্য ট্রাম্পকে কংগ্রেসের সামনে জবাবদিহি করতে হতে পারে।
এই সময়সীমা অতিক্রান্ত হতে বেশি দেরি নেই।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে ইরানের বিরুদ্ধে যুগপৎ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। শক্তিশালী দুই দেশের বিমান হামলার মুখে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জবাব দেয় ইরান। ওই হামলার শিকার হয় ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো।
হামলার শুরুতেই পারস্য উপসাগর সংলগ্ন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। যার ফলে, বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে তীব্র সংকট দেখা দেয়। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পারাপারের ওই গুরুত্বপূর্ণ পথ হারিয়ে কার্যত বৈশ্বিক তেলের বাজার পথ হারা হয়ে পড়ে—হুহু করে বাড়তে থাকে দাম।
এই সংকটের জেরে বেশ কয়েকটি দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। পাশাপাশি, উপসাগরীয় দেশগুলোতে সংঘাত চলাকালে প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বেড়েছে পণ্যের দাম। পাশাপাশি, বিরোধী দলের কাছ থেকেও বিপুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। সব মিলিয়ে, তিনিও চাইছেন দ্রুত ‘নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করে’ সংঘাতের অবসান ঘটাতে।
খেয়ালী ও পাগলাটে হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকান নেতা কী করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

