প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইসরায়েলকে পাশে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালিয়ে অনন্য রেকর্ড গড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর অনুরোধ জানিয়েও হালে পানি পাননি ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
সাবেক আবাসন ব্যবসায়ী ট্রাম্প ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, তাদের সমন্বিত হামলার মুখে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে ইরান। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর দেশটির নেতৃত্ব দিশেহারা, সেনাবাহিনী ছন্নছাড়া ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত হবে—এমনটাই ধারণা ছিল তাদের। তবে বাস্তবে তা হয়নি।
বরং প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সেই যুদ্ধ এখন ট্রাম্পের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক সব উদ্যোগে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধ থেকে যত দ্রুত সম্ভব বের হয়ে আসতে চায় মার্কিনিরা।
কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ তো দূরের কথা, উল্টো এর মাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
গত জুলাইয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটন ৬০ দিনের একটি শান্তি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। দুই পক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এই সময়ের মধ্যে তারা নিজেদের সব ব্যবধান দূর করে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে সই দেবে। তবে চলতি সপ্তাহে সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। এ সময় ইরানের কট্টরপন্থি নেতারা যে বার্তা দিয়েছেন, তা ট্রাম্পের জন্য মোটেও সুখকর নয়।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্বে একটি স্পষ্ট বিভাজন দেখা যায়। একদিকে রয়েছে উদারপন্থি একটি গোষ্ঠী, যারা আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে আগ্রহী। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত।
অপরদিকে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিসহ বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের নিয়ে তৈরি একটি গোষ্ঠী কট্টরপন্থি হিসেবে বিবেচিত।
এতদিন উদারপন্থি নেতাদের অবস্থান মেনে কূটনীতির ওপর ভরসা রাখলেও সাম্প্রতিক সময়ে কট্টরপন্থি নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত রাখার নিজস্ব কৌশল তৈরি করে তার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে।
একজন ইরানি কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানান, এই কৌশলে শত্রুর হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি ‘আক্রমণাত্মক অভিযান’-এর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
গত ১৭ আগস্ট ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তি স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ইরানের কট্টরপন্থি নেতারা কূটনীতির বদলে গোপনে যুদ্ধের কলেবর বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ লক্ষ্যে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।
পাশাপাশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননের মিলিশিয়াদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি।
অভিজ্ঞ সামরিক জেনারেলদের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পদে বসানোর কাজও সেরে নিয়েছে ইরান—এমন দাবি করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক নেতারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের মতো শক্ত অবস্থানে তারা রয়েছেন। একই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে ব্যবধান কমাতে অস্ত্রসজ্জা আরও উন্নত ও হালনাগাদ করার চেষ্টা চালাচ্ছে তেহরান।
গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নামে জারি করা কয়েকটি সরকারি আদেশে তেহরানের নতুন অবস্থান স্পষ্ট হয়। এসব আদেশে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন করা হয়।
মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার বলেন, ‘ইরানের শর্ত পূরণ না হলে যুদ্ধকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার কৌশল নিঃসন্দেহে বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে।’
সিএনএনের প্রশ্নের উত্তরে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি জানান, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজাই বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর এমন একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত, যারা মনে করে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের একমাত্র উপায় হলো লড়াই চালিয়ে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিরন্তর যন্ত্রণার মধ্যে রাখা।’
আহমাদ ওয়াহিদিকে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর প্রধান হিসেবে অনুমোদনের সময় জারি করা সরকারি আদেশে ‘শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের’ জন্য প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিশ্লেষক ও ক্লিংএন্ডেল ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা হামিদরেজা আজিজির মতে, ‘এটা স্পষ্ট যে ওয়াহিদিকে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামরিক কৌশলকে আরও দৃঢ় ও আক্রমণাত্মক দিকে নিয়ে যাওয়া।’
ওই আদেশ জারির কয়েক দিন পর বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারসকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ইরান প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগে নিজেদের সীমিত রেখেছে। তবে ভবিষ্যতে এগুলো আক্রমণাত্মক রূপ নিতে পারে।’
ওয়াহিদির উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি বলেন, ইরানের সেনা ‘শত্রুর ভূখণ্ডে’ অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে তিনি বলেন, ‘যখনই প্রয়োজন হবে ও নির্দেশ দেওয়া হবে, তখনই আমাদের শত্রুর ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর সক্ষমতা থাকতে হবে।’
‘ইরানের সেনাকে বুদ্ধিদীপ্ত, নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হাতে নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’, যোগ করেন নাকদি।
ইরানের এই কৌশলগত পরিবর্তনের অর্থ, আবার ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে তেহরান।
সম্প্রতি ইরানের সেনাবাহিনী নতুন প্রজন্মের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করেছে। এগুলোতে ক্লাস্টার ওয়ারহেড যুক্ত করা হচ্ছে এবং এই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যে আঘাত হানার আগে প্রয়োজনে গতিপথ বদলাতে সক্ষম। পাশাপাশি কম খরচের ড্রোন ব্যবহারে দক্ষতা দেখিয়েছে ইরান।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ফেলো এইচ এ হেলিয়ার বলেন, ‘ইরানের শাসকগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলা করেও দৃঢ়ভাবে টিকে আছে।’
সিএনএনকে হেলিয়ার বলেন, ‘এখন তারা এই টিকে থাকার সক্ষমতাকে এই অঞ্চলে স্থায়ী রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করতে চাইছে। তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোগটিকে নষ্ট হয়ে যেতে দিতে চাইছে না।’
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের ত্রিতা পারসি বলেন, ‘তেহরান মনে করছে, সামরিক দিক থেকে তারা এগিয়ে আছে এবং শুধু মার্কিন হামলার জবাব দেওয়ার পরিবর্তে নিজেরাই আক্রমণে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যেই আলোচনা করছে।’
‘এর মাধ্যমে ইরান শুধু যুদ্ধের পরিধির নিয়ন্ত্রণই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেড়ে নেবে না, যুদ্ধের সময় নির্ধারণের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নেবে’, যোগ করেন পারসি।
বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, ইরান স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি দেশটির বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধ নেই, শান্তিও নেই’ বলে আখ্যা দেন।
তার মতে, ইরান নানা অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। এই পরিস্থিতিতে দেশটির নেতৃত্ব এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে। এতে ট্রাম্প ইরানের বন্দর অবরোধ করা থেকে বিরত হবেন অথবা এমন একটি চুক্তিতে বাধ্য হবেন, যা ইরানের জন্য মঙ্গলজনক হবে—এমনটাই ভাবছেন কট্টরপন্থি নেতারা।
আজিজি আরও বলেন, ‘ইরানি নেতৃত্ব হয়তো এই সিদ্ধান্তে আসতে পারে যে আরেকটি যুদ্ধে জড়ানোর মূল্য নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের দ্বৈত চাপে ধীরে ধীরে নিজেদের হারিয়ে ফেলার চেয়ে কম।’
ইরানের এই নতুন আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গির একটি অংশ হলো, তারা এ অঞ্চলে যাতায়াতকারী তেলবাহী জাহাজগুলোর ওপর হঠাৎ হামলা চালাতে থাকবে, যাতে তেলের দাম বাড়ে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এডিএনওসির পরিচালনায় থাকা বেশ কয়েকটি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান।
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তারা নাশকতার মাধ্যমে উপসাগরের ভেতর দিয়ে যাওয়া একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত করার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এটিও যুদ্ধকৌশলের অংশ হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে ইরানের কৌশলগত প্রাধান্যে পরিবর্তন আসতে পারে। হিজবুল্লাহ, হুতি ও ইরাকের মিত্র মিলিশিয়াদের মতো গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরতা ও তাদের প্রতি সমর্থন কমাতে পারে তেহরান।
আজিজি বলেন, ‘এই অরাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার তুলনায় কিছুটা গৌণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ইরানের কমান্ডার ও নেতাদের যে বাড়তি আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তাতে আগাম হামলার কৌশলের দিকে পরিবর্তনের লক্ষণ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।’
অন্যদিকে, মার্কিন জনমনে এই যুদ্ধ ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের জেরে বারবার বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম, যার প্রভাব পড়ছে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামেও। সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন মার্কিনিরা।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জনরোষের প্রভাবে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল বড় ধরনের নির্বাচনী ধাক্কা খেতে পারে। মাত্র ৩৩ শতাংশ জনপ্রিয়তার হার নিয়ে কীভাবে মেয়াদের বাকি অংশ পার করবেন ট্রাম্প, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ইরান যুদ্ধ এ ক্ষেত্রে তাকে কোনো ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে না।

