ইরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল আমিরাত

ইরানের সেনাবাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে—এমন অভিযোগ তুলে দেশটির ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

তবে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আজ বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা।

আজ ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য, বাণিজ্যিক লেনদেন ও আর্থিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’

এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে।

এর একটি দেশটির জলসীমার বাইরে এবং অন্যটি জলসীমার ভেতরে গিয়ে পড়েছে।

পরে দেওয়া আরেক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ‘সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে’ ছোড়া হয়েছিল।

দেশটির নিরাপত্তার ওপর কোনো ধরনের হুমকি অথবা নৌযান চলাচল বিঘ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা ‘দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা’ করার অঙ্গীকারও করে তারা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মত দেন, এটি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত অভিযান। চলমান যুদ্ধে ইরানের স্বার্থহানির উদ্দেশ্যে এই ‘ভুয়া’ অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বাঘাই সতর্ক করে বলেন, আমিরাতের কাছ থেকে আসা এ ধরনের অভিযোগ ভালো প্রতিবেশীসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ নয়।

তিনি এ অঞ্চলের দেশগুলোকে তেহরানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ না আনার আহ্বান জানান।

একইসঙ্গে তিনি বলেন, নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ডগুলোকে’ বিবেচনায় নিতে হবে।

পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে কোনো অগ্রগতি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনার ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার এক দিন পর মঙ্গলবার এই হামলার ঘটনা ঘটে।

যুদ্ধের প্রথম ছয় সপ্তাহে উপসাগরীয় অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে বেশি পাল্টা হামলা চালায় ইরান।

আমিরাতে স্থাপিত ‘মার্কিন অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে ৫৩০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কয়েক ডজন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন ছোড়ে ইরান।

মঙ্গলবারের হামলাটি মে মাসের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে প্রথম হামলা। এর কয়েক দিন আগে আবুধাবি অভিযোগ করেছিল, হরমুজ প্রণালিতে তাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এডিএনওসি (আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি)-র দুটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে তেহরান।

এডিএনওসির জাহাজে হামলার দায় স্বীকার করেনি ইরান।

ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ বজায় রাখার মধ্যেই এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল সংযুক্ত আরব আমিরাত।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে সামরিক চাপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ও সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিট আল জাজিরাকে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ওয়াশিংটনের আরোপ করা যেকোনো নিষেধাজ্ঞার চেয়েও ইরানকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তার মতে, নীরবে দুবাই ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। চীন ও তুরস্ককে ছাড়িয়ে প্রতি বছর ইরানের মোট আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পণ্য সরবরাহ করে দুবাই।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর মার্চের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। জুনের শেষ দিকে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর দিয়ে আবার বাণিজ্য শুরু হয়।

কিমিট বলেন, ‘দুবাই ও ইরানের মধ্যে আর্থিক ও পণ্য বাণিজ্যের গুরুত্বকে বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখার কোনো সুযোগ নেই।’

এই নির্ভরতা শুধু জাহাজে পণ্য পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে দুবাইয়ের অবস্থানের কারণে ইরান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ স্থানান্তরের একটি গোপন পথ হিসেবে শহরটিকে ব্যবহার করে আসছে বলে জানান কিমিট। এখন সেই পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরোপ করা এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

সাবেক এই জেনারেল বলেন, অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এখনই একই পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি মনে করেন না। ইরানের হামলা অব্যাহত থাকলেও তারা ‘অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার’ নীতি অনুসরণ করবে বলে ধারণা তার।

তবে তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তেহরান এটিকে যুদ্ধ ঘোষণার কাছাকাছি কোনো পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা প্রায় সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এর তুলনা করেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts