ইউজিসিতে অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপট: পদত্যাগপত্রে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এর প্রশাসনে একদল ‘অসৎ ও দুর্নীতিপ্রবণ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী আধিপত্য বিস্তার করে আছে বলে অভিযোগ করেছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। নিজের পদত্যাগপত্রে তিনি এ অভিযোগ করেন।

গত ২৩ এপ্রিল ইউজিসির পূর্ণকালীন সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করা এই অধ্যাপক উল্লেখ করেন, কমিশনের বর্তমান পরিস্থিতিতে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা ‘সার্বক্ষণিক চ্যালেঞ্জ এবং অসীম ধৈর্যের’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এবং দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা ওই চিঠিতে কুৎসা রটনা, রাজনৈতিক লবিং, স্বার্থের সংঘাত, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘হিট’ প্রকল্প নিয়ে চাপ এবং টেন্ডার লবিংয়ের মতো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রেষণে ইউজিসিতে যোগ দেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যোগদানের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি অনুধাবন করেন যে কমিশন একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেনি।

তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে অনেক দক্ষ ও সৎ মানুষ কাজ করলেও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ একদল ‘অদক্ষ, ভয়ানক চতুর, মিথ্যা উপস্থাপনে পারদর্শী এবং অসৎ ও দুর্নীতিপ্রবণ’ মানুষের হাতে। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই গোষ্ঠীর কেউ কেউ তাদের রাজনৈতিক আনুগত্যও পরিবর্তন করেন।

অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, তার সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা কমিশনের ভেতরের ও বাইরের অনেকেরই বিরাগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারণ তারা তাদের ‘ব্যক্তিগত অসৎ আকাঙ্ক্ষা’ চরিতার্থ এবং ‘চিরাচরিত দুর্নীতি’ চালিয়ে যেতে পারছিলেন না। 

তার দাবি, এই চক্রটি তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন পোর্টাল এবং ‘হলুদ’ সাংবাদিকদের ব্যবহার করেছে।

বিশ্বব্যাংক ও সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘হিট’ প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বলেন, তার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে। যদিও ইউজিসি এসব অভিযোগকে আগেই ভিত্তিহীন বলে ঘোষণা করেছিল। (তবে দ্য ডেইলি স্টার এই চিঠির অভিযোগগুলো স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি)।

তিনি চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর একই ধরনের ‘অসার, মিথ্যা ও মনগড়া’ অভিযোগ অনলাইনে ও পত্রিকায় আবারও ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যার কোনো প্রমাণ আজও মেলেনি। বর্তমান কমিশনের এ ব্যাপারে নীরবতা এবং অবস্থান স্পষ্ট না করায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

পদত্যাগপত্রে ইউজিসির একজন নামহীন সদস্যের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। তবে যোগাযোগ করা হলে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন ওই সদস্যের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

তার অভিযোগ, নির্বাচনের সময় ওই সদস্য ‘হিট’ প্রকল্প, পরিকল্পনা উন্নয়ন বিভাগ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেন। কর্মকর্তাদের সংগঠন ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহায়তায় ওই সদস্য সম্প্রতি পদত্যাগ করা চেয়ারম্যানের ওপর ‘দায়িত্ব পুনবণ্টনের’ নামে মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন বলেও তিনি দাবি করেন। 

এমনকি জেলা ও পারিবারিক সম্পর্ক ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায় থেকে ওই সদস্যের জন্য রাজনৈতিক লবিং করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চিঠি অনুযায়ী, ওই সদস্য তৎকালীন চেয়ারম্যানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ১২ ফেব্রুয়ারির পর কমিশন আর আগের মতো চলতে পারবে না। তানজীমউদ্দিনের দাবি, প্রধানত ওই সদস্যের চাপের কারণেই সহকারী পরিচালক নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

‘হিট’ প্রকল্পে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ তুলে তিনি লেখেন, ওই সদস্য একটি ক্লাস্টারের অধীনে গবেষণার প্রস্তাব মূল্যায়ন করছিলেন, যেখানে তার জীবনসঙ্গীও গবেষণার প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। ওই সদস্য এই তথ্য গোপন করেছিলেন, যা ‘সম্পূর্ণরূপে অনৈতিক ও আইন বহির্ভূত’। পরে অবশ্য তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া মিরপুরের ইউজিসি বাংলো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সংস্কার করতে ৪৮ লাখ টাকা এবং অফিস কক্ষ সাজাতে ৫ লাখ টাকা ওই সদস্য ‘হিট’ প্রকল্প থেকে দাবি করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন তানজীমউদ্দিন। সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় ও অনুমোদনহীন ডেকোরেশন সামগ্রী অফিস থেকে সরিয়ে নিতে বলায় তিনি ওই সদস্যের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।

অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন আক্ষেপ করে লেখেন, এসব পরিস্থিতি দেখে তার মনে প্রশ্ন জেগেছে— আসলে কী পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল? এই ‘দুষ্ট চক্রের’ কাছে ২০২৪-এর আগস্টের চেতনার চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা ও পদোন্নতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি জানান, ইউজিসির পদের প্রতি তার কোনো মোহ ছিল না, তিনি এটিকে দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন। এই ১৯ মাসে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় পিছিয়ে পড়েছেন এবং নিজের শিক্ষার্থী ও পরিবারকে সময় দিতে পারেননি। ‘তাই কমিশনের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করলাম,’ চিঠিতে লেখেন তিনি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

 

 

Related Articles

Latest Posts