আলোর অপেক্ষায় অন্ধকার চোখ

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ৬৫ বছর বয়সী বিধবা সালেমা বেওয়া। চোখের ছানিতে তার পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। একসময় ছিলেন পরিবারের নির্ভরযোগ্য সদস্য। তিনি রান্না করতেন, সবার যত্ন নিতেন এবং ঘরসংসার সামলাতেন। কিন্তু এখন তিনি ছোটখাটো দৈনন্দিন কাজ করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। সম্প্রতি বাড়ির আঙিনায় পড়ে গিয়ে তিনি কোমরে মারাত্মক চোট পেয়েছেন।

তার ছেলে আমজাদ হোসেন একজন দিনমজুর। ছেলের সামান্য আয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদাই মেটানো দায়। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাতায়াতের খরচ এবং সময়ের অভাব—সব মিলিয়ে সালেমার চোখের অস্ত্রোপচার করা পরিবারের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এখন সালেমার বয়সের কথা ভেবে তার পরিবারের সদস্যরাও সন্দেহ করছেন, এই বয়সে আদৌ অস্ত্রোপচার করাটা ঠিক হবে কি না।

সালেমা অনেকটা ভাগ্যের ওপর হাল ছেড়ে দিয়ে ভারী কণ্ঠে বললেন, ‘কে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে আর পরীক্ষার খরচই বা কে দেবে? আর কয়দিনই বা বাঁচব? এর চেয়ে এভাবেই না হয় দিন চলে যাক।’

পুঠিয়া উপজেলার একজন চিকিৎসক সালেমার চোখের ছানি কাটার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই কথা মনে করে আমজাদ বলেন, ‘সদর হাসপাতালের মতো সরকারি জায়গায় খরচ কম হবে ঠিকই, কিন্তু রাজশাহীতে যাওয়া, সেখানে থাকা এবং অস্ত্রোপচারের পর মাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা—পুরোটাই অনেক ঝক্কির কাজ। আর উপজেলা পর্যায়ের বেসরকারি ক্লিনিকগুলো আমাদের মতো মানুষের জন্য বড্ড বেশি ব্যয়বহুল।’

সালেমার এই অভিজ্ঞতা আসলে একটি বৃহত্তর জাতীয় সংকটেরই প্রতিফলন। হাজার হাজার মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন—তার কারণ এই নয় যে দেশে অস্ত্রোপচারের প্রযুক্তি নেই, বরং দারিদ্র্য, হাসপাতালের দূরত্ব এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা বাধার কারণে তারা রোগ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে চিকিৎসা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছেন না।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্যাটারাক্ট অ্যান্ড রিফ্রাক্টিভ সার্জনসের (বিএসএসআরএস) তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ রোগী চোখের ছানি অপারেশনের অপেক্ষায় আছেন। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে ছানি রোগীর যে প্রাথমিক পরিসংখ্যান রয়েছে, তা অত্যন্ত পুরনো এবং সেকেলে।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালের  (এনআইওএইচ) সাবেক পরিচালক এবং বিএসএসআরএসের নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা রোগীর যে বর্তমান জট বা ব্যাকলগ ধরা হচ্ছে, তা মূলত ২০০০ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা। সেই হিসাবে তখন সাড়ে সাত লাখ রোগী ধরা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল যে প্রতি বছর এই তালিকায় আরও ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি নতুন রোগী যুক্ত হবে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চিকিৎসাবিহীন চোখের ছানির বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দৃষ্টিহীনতার শিকার বেশি হন নারীরা, অথচ পুরুষদের তুলনায় তারা ছানির অস্ত্রোপচারের সুযোগ পান অনেক কম।

দেশের আটটি জেলায় ২১ হাজার ৫৯৬ জনের ওপর পরিচালিত ‘র‍্যাপিড অ্যাসেসমেন্ট অব অ্যাভয়েডেবল ব্লাইন্ডনেস’ সমীক্ষায় দেখা গেছে, পুরুষদের মধ্যে অস্ত্রোপচার করানোর হার (৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ ) নারীদের (৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি।

২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, অন্ধত্বের প্রধান কারণ হলো চোখের ছানি। ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি হারানোর প্রায় ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশই ঘটে ছানির কারণে।

২০২৫ সালে চট্টগ্রামের লায়ন্স চ্যারিটেবল আই হাসপাতালে ৫৯৫ জন ছানি রোগীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের সময় সঙ্গে যাওয়ার মতো কেউ নেই— যেখানে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ এই সমস্যার কথা জানিয়েছেন, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ২৮ দশমিক ১ শতাংশ।

এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের ফল খারাপ হতে পারে—এমন দুশ্চিন্তা করার হারও নারীদের ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি (নারীদের ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পুরুষদের ১৬ দশমিক ২ শতাংশ)। আর এই কারণেই নারীদের মধ্যে মানসিকভাবে উদ্বেগের পরিমাণ অনেক বেশি দেখা গেছে।

পাশাপাশি, যে রোগীরা চিকিৎসা নিতে সমস্যায় পড়েছেন, তাদের মাত্র ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ জানতেন কী ধরনের চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব। তবে পুরুষদের চেয়ে নারীরা এ বিষয়ে অনেক কম জানতেন—পুরুষদের মধ্যে সচেতনতার হার ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

অধ্যাপক খায়েরের পর্যবেক্ষণ, ‘আমাদের দেশে পুরুষেরা অসুস্থ হলে তাদের দ্রুত ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়, কিন্তু নারীরা অসুস্থ হলে পরিবার অনেক সময় দেরি করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গ্রামের নারীরা চোখের দৃষ্টি কমে যাওয়া সত্ত্বেও ঘরের কাজ চালিয়ে যান। এর ফলে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে বিষয়টি ততক্ষণ জরুরি মনে হয় না, যতক্ষণ না তারা দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন।’

চাপে থাকা চিকিৎসাব্যবস্থা

বিএসসিআরএসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২ হাজার ২০০-এর বেশি নিবন্ধিত চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলেও তাদের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২০০ জন ছানি অপারেশন করে থাকেন।

কিন্তু অধ্যাপক খায়েরের মতে, মাত্র ৪০০-৫০০ জন সার্জনের অনেক বেশি ছানি অপারেশন করার অভিজ্ঞতা আছে। ১০ লাখ অপেক্ষমাণ রোগীর হিসেবে প্রত্যেক সার্জনের ভাগে গড়ে ৮৩৩ জন করে রোগী পড়ে, যা একটি বিশাল চাপের বিষয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পদায়ন বা বণ্টন ব্যবস্থা মূলত বড় শহরগুলোর দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে।

অধ্যাপক খায়ের ব্যাখ্যা করেন, ‘যদি একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞকে এমন কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ দেওয়া হয় যেখানে অপারেশনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই, তবে সেখানে তার কাজ করার সুযোগ খুব কম থাকে। ফলে বিশেষজ্ঞরা স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা বা বড় বিভাগীয় শহরগুলোর দিকে চলে আসেন।’

এই ব্যবধান ঘোচানোর জন্য আগে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া ন্যাশনাল আই কেয়ার কর্মপরিকল্পনার অধীনে পর্যায়ক্রমে প্রায় ২০০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কমিউনিটি আই সেন্টার স্থাপন করা হয়।

এসব সেন্টারে তিনজন করে প্রশিক্ষিত নার্স রোগীদের প্রাথমিক পরীক্ষা করতেন। এরপর বিনামূল্যে অপারেশন এবং যাতায়াত খরচের সুবিধাসহ তাদের নির্ধারিত ১৩টি সরকারি মেডিকেল কলেজে পাঠানো হতো।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে। প্রকল্পটিকে নো-কস্ট এক্সটেনশনের আওতায় রাখা হয়, যার অর্থ হলো এই প্রকল্পের জন্য নতুন করে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

তবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, যদি সরাসরি গ্রামীণ জনপদে রোগীদের পরীক্ষা এবং যাতায়াত সুবিধা দেওয়া যায়, তবে সেবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা সম্ভব।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দিনাজপুরে কিউর ব্লাইন্ডনেস প্রজেক্টের আওতায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৩টি উপজেলার প্রায় ২ হাজার ৪০০ সুবিধাবঞ্চিত ছানি রোগীকে সেবা দেওয়া হয়েছে।

হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় গাউসুল আজম বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে, যার মাধ্যমে রোগীদের পরীক্ষা, যাতায়াত, অপারেশন এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা হয়।

গ্রাম এলাকায় চোখের ক্যাম্প করার ফলে বয়স্ক রোগীদের হাসপাতালে যাওয়ার প্রথম দিকের খরচ বেঁচে যায় এবং সঙ্গে কাউকে নেওয়ার চিন্তা করতে হয়নি।

বাছাইকৃত রোগীদের বাড়ি থেকে হাসপাতালে নেওয়া, অপারেশন করা এবং সুস্থ হওয়ার পর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সব ব্যবস্থা করা হয় বিনামূল্যে। বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়সী গ্রাম্য নারী, প্রতিবন্ধী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের এই সেবায় সবার আগে সুযোগ দেওয়া হয়।

পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারি পরিকল্পনা

দেশের ১০ লাখ চোখের ছানি অপারেশনের জট কাটাতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানান, সরকারি, বেসরকারি এবং এনজিও খাতের সম্মিলিত সম্পদ ও সক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

বছরে দুই লাখের বেশি অপারেশন নিশ্চিত করতে দেশের চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে অ্যাকটিভ সার্জনদের বাছাই করে তাদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আট থেকে ১০টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে।

মুহিত বলেন, ‘চিকিৎসা সেবার সীমাবদ্ধতাগুলো খুঁজে বের করতে আমরা বর্তমানে দেশব্যাপী একটি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছি। যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই আমরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল সরবরাহ করব।’

স্বাস্থ্যসেবায় নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার বিষয়ে তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় সচেতনতামূলক কর্মসূচিগুলোতে বিশেষ করে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সচেতন করা হবে। এর ফলে তারা যেন বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের চোখের চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দেন।

এ ছাড়া, বছরের শেষ নাগাদ একটি নতুন কারিগরি জরিপ চালানো হবে, যেখানে কয়েক দশকের পুরনো প্রাথমিক তথ্যের পরিবর্তে হালনাগাদ তথ্য উঠে আসবে।

প্রতিমন্ত্রী মুহিত বলেন, ‘আমরা সফল হলে গ্রামীণ চক্ষুসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সারাবিশ্বের কাছে একটি রোল মডেল হয়ে উঠবে। এটি আসলে লাখো মানুষের কর্মক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই।’

তবে সালেমার কাছে সাফল্যের মাপকাঠি রাজধানী থেকে ঘোষিত কোনো সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা নয়; বরং সাফল্য তখনই আসবে, যখন কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের একজন দরিদ্র নারী শেষ পর্যন্ত অপারেশন টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন এবং সেই সামর্থ্য অর্জন করবেন।
 

Related Articles

Latest Posts