আড়াইশ বছরে যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিকামী মানুষকে কতটা স্বপ্ন দেখাতে পারছে

৪ জুলাই ১৭৭৬। ফিলাডেলফিয়ার একটি হলে ৫৬ জন প্রতিনিধি স্বাক্ষর করলেন একটি ঘোষণাপত্রে। তাতে লেখা ছিল, ‘আমরা এই সত্যগুলো স্বতঃসিদ্ধ বলে মানি—সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে। তাদের স্রষ্টা (ঈশ্বর) কিছু অপরিবর্তনীয় অধিকার দিয়েছেন। এর মধ্যে আছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের সন্ধান করার অধিকার।’

আজ ২০২৬ সালের ৪ জুলাই, ‘ডিক্লারেশন অব ইনডিপেন্ডেন্স’ নামে সেই ঘোষণার ২৫০ বছর পূর্ণ হলো। ‘সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল’ বা ‘আমেরিকা ২৫০’ নামে পরিচিত এই মাইলফলক উদযাপন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চলছে নানা উৎসব-আয়োজন।

এই ঘোষণাপত্র শুধু একটি ঔপনিবেশিক বিচ্ছেদের দলিল নয়, বরং আধুনিক গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধারণাকে বিশ্বমঞ্চে নতুন ভাষা দিয়েছিল। 

স্বাধীনতার জন্মকথা

সতেরোশ শতাব্দী থেকে ব্রিটেন উত্তর আমেরিকায় ১৩টি উপনিবেশ গড়ে তোলে। প্রথম দিকে উপনিবেশবাসীরা ব্রিটেনের প্রতি অনুগত ছিলেন। কিন্তু ১৭৬০-এর দশকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। 

সাত বছরের যুদ্ধের (ফ্রেঞ্চ অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ওয়ার) পর ব্রিটেনের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে। এই চাপ সামলাতে ব্রিটিশ সরকার উপনিবেশগুলোর ওপর নানা ধরনের কর আরোপ করে, যেমন স্ট্যাম্প অ্যাক্ট (১৭৬৫), টাউনশেন্ড অ্যাক্টস এবং সবশেষে টি অ্যাক্ট (১৭৭৩)।

উপনিবেশবাসীরা এসব করকে ‘ট্যাক্সেশন উইদাউট রিপ্রেজেন্টেশন’ (প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর) বলে বিরোধিতা করেন। তারা বলতেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধি নেই, অথচ কর দিতে হচ্ছে। 

এসব অসন্তোষ ধীরে ধীরে রূপ নেয় সশস্ত্র সংগ্রামে। ১৭৭৪ সালে প্রথম কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস বসে। ১৭৭৫ সালে লেক্সিংটন ও কংকর্ডের যুদ্ধের মাধ্যমে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। জর্জ ওয়াশিংটনকে কন্টিনেন্টাল আর্মির প্রধান নেতৃত্ব দেওয়া হয়। এই যুদ্ধই ইতিহাসে আমেরিকান বিপ্লব বা আমেরিকান রেভল্যুশনারি ওয়ার নামে পরিচিত।

১৭৭৬ সালের ৭ জুন কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসে রিচার্ড হেনরি লি উপনিবেশগুলোকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার প্রস্তাব দেন। নেতারা বুঝেছিলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিদ্রোহী প্রজা হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই ফ্রান্সসহ বিদেশি শক্তির সমর্থন পাওয়া সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

দলিলটির খসড়া লেখার দায়িত্ব পান থমাস জেফারসন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ও জন অ্যাডামসসহ অন্য নেতাদের পরামর্শে তিনি এমন একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করেন, যেখানে নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।

এই দলিলেই প্রথমবার বিশ্বের সামনে আসে ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’ নামটি। ঘোষণাপত্রটি গোটা বিশ্বের মানুষের মতামতের প্রতি সম্মান জানিয়েই লেখা হয়েছিল।

২ জুলাই কংগ্রেস স্বাধীনতার প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং ৪ জুলাই ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স গৃহীত হয়। 

তবে এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেরও সীমাবদ্ধতা ছিল। জেফারসনের খসড়ায় দাসপ্রথার সমালোচনা থাকলেও দক্ষিণের উপনিবেশগুলোর (বিশেষ করে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়া) বিরোধিতা ও উত্তর–দক্ষিণ রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে দাসপ্রথা–সংক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়া হয়।

ফলে স্বাধীনতার ঘোষণা সত্ত্বেও দেশটিতে দাসপ্রথা বহাল ছিল, নারীদের ভোটাধিকার ছিল না এবং আদিবাসীরা নিজেদের ভূখণ্ডেই ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছিল।

এদিকে, স্বাধীনতা ঘোষণার পরও যুদ্ধ চলতে থাকে। ১৭৭৭ সালে সারাটোগার যুদ্ধে জয়ের পর ফ্রান্স ১৭৭৮ সালে আমেরিকার পক্ষে যোগ দেয়। পরে স্পেন (১৭৭৯) ও নেদারল্যান্ডসও (১৭৮০) যোগ দেয়। 

অবশেষে ১৭৮১ সালের ইয়র্কটাউনের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ১৭৮৩ সালের প্যারিস চুক্তিতে ব্রিটেন স্বাধীনতা স্বীকার করে।

স্বাধীনতার ২৫০ বছর পর কেমন আছে আমেরিকা?

স্বাধীনতার ২৫০ বছরে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন এক বৈপরীত্যের দেশ। 

বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনও অনস্বীকার্য। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই আমেরিকান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও উচ্চশিক্ষায় দেশটি এখনও বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। 

একই সঙ্গে ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে চীনের উত্থান ও বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার বিকাশ যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাবকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

তবে দেশটির ভেতরের চিত্র আরও জটিল। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক বিভাজন এখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

অভিবাসন, গর্ভপাতের স্বাধীনতা, বন্দুক নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বাচন ব্যবস্থা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই তীব্র রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক আমেরিকান এখন জাতীয় দিবসের উদযাপনকেও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখছেন।

গণতন্ত্র নিয়েও চলছে বিতর্ক। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আগের তুলনায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা কমেছে। 

তবুও বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভিত্তি, যা সংকটের মধ্যেও দেশটিকে টিকিয়ে রেখেছে।

বিশ্বমঞ্চেও আমেরিকার অবস্থান বদলাচ্ছে। একসময় যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, এখন সেই অবস্থান আরও বেশি বিতর্কিত। মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, বাণিজ্যনীতি ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রশ্নে ওয়াশিংটনকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

 

Related Articles

Latest Posts