দেশজুড়ে অপরাধ ও সহিংসতা যত বাড়ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগও তত বাড়ছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।
এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর (পিএইচকিউ) একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছ। এতে সভাপতি হিসাবে রয়েছে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম।
এই কমিটি অধীনে অন্তত আটটি উপকমিটি গঠন করেছে। যারা সংগঠিত অপরাধ, সাইবার অপরাধ ও মাদক ব্যবসা দমনে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ করবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে নিশ্চিত করেছেন যে, উপকমিটিগুলো ইতিমধ্যেই তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা, মাঠপর্যায়ের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা এবং অপরাধ প্রতিরোধ থেকে শুরু করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা নির্ধারণে সুপারিশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই উপকমিটিগুলোকে।’
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টিও এই কমিটির অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন দেশব্যাপী একের পর এক সহিংস ঘটনা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অপরাধী চক্রের হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা এবং গণপিটুনির (মব ভায়োলেন্স) মতো ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে কেবল ঢাকা মহানগরেই অন্তত ৫৯৭টি খুনের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে অপরাধী চক্রগুলোর নিজেদের মধ্যকার এলাকা দখলকে কেন্দ্র করে। নিহতদের মধ্যে চারজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ অপরাধী ছিলেন।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকার বলেছিল, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তবে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
পিএইচকিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে দেশজুড়ে ৯১৫টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
২০২৫ সালে একই সময়ে মামলার সংখ্যা ছিল ৯৯৩, যার মধ্যে ২২৬টি মামলা পুরোনো ঘটনার জেরে দায়ের করা।
গত ১২ জুন রাজধানীর রামপুরা এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে কাইল্লা পলাশকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল হামলাকারী এখনো পলাতক।
এর আগে ২৮ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের কাছে সশস্ত্র হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। এ হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস পার হলেও এখনো এর কোনো সূত্র বা কারণ খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা। এমনকি এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার মূল চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনা এবং পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে একটি বৈঠক করেছি আমরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘পেশাদারিত্ব বাড়ানোর জন্য আমরা কিছু সুপারিশ তৈরির কাজ করছি। চূড়ান্ত হওয়ার পর তা উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে।’
তবে উপকমিটিগুলোর সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি নন অতিরিক্ত আইজিপি।
যা করবে উপকমিটিগুলো
পুলিশ সদর দপ্তরের ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ডিআইজি আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি সাত সদস্যের উপকমিটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে।
সূত্রমতে, অপরাধের ধরন, সংগঠিত অপরাধী চক্র এবং গ্যাংগুলোর কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করবে এই কমিটি।
গত ২২ জুন এই কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সক্ষমতা বৃদ্ধি
অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের জনবল বাড়ানোসহ অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আরেকটি কমিটিকে।
সাইবার অপরাধ দমন
সাইবার অপরাধ, জালিয়াতি এবং অনলাইনে হয়রানি ও হুমকি মোকাবিলায় সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজির নেতৃত্বে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে।
এটি সাইবার ও আর্থিক অপরাধের তদন্তে বিশেষ ফরেনসিক পরীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কমিটির এক সদস্য দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, পুরোদমে কাজ করছেন তারা।
আগাম সতর্কতা ও জরুরি সাড়া
রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ এবং উগ্রবাদ বৃহৎ পরিসরের আইন-শৃঙ্খলা মোকাবিলায় পরিস্থিতির অবনতি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পাঁচ সদস্যের আরেকটি কমিটিকে।
ডিজিটাল সেবা
প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং সেবা চালুর লক্ষ্যে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি স্মার্ট ট্র্যাকিং সিস্টেম, বডি-ওর্ন ক্যামেরা, অনলাইন জিডি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়ানোর উপায় সুপারিশ করবে।
অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার কৌশল নির্ধারণে কাজ করবে আরেকটি কমিটি।
প্রশিক্ষণ ও কমিউনিটি পুলিশিং
এ ছাড়া আরও দুটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে একটি কমিটি—মানবাধিকার, জবাবদিহিতা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করবে এবং অপরটি পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করবে।
এ ছাড়া পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চকে (এসবি) কে দেশের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃসমন্বয় বৃদ্ধির কৌশল নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত তাদের কার্যক্রম ও কৌশল পর্যালোচনা করতে হয়। কোথায় আরও উন্নতির সুযোগ আছে এবং কীভাবে অভিযান আরও কার্যকর করা যায়, তা সব সময়ই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।’
এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কিছু উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই বিষয়গুলো নতুন করে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।’
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেন আশরাফুল হুদা।

