ছোটবেলা থেকেই দেশের মানচিত্র ও জাতীয় পতাকার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল রাফান মাশরুর হকের। অন্য শিশুদের মতো শুধু গল্পের বই কিংবা খেলাধুলায় সীমাবদ্ধ ছিল না তার কৌতূহল। একটি দেশের নাম শুনলেই সেই দেশটি পৃথিবীর কোন প্রান্তে, তার আশপাশে কোন কোন দেশ রয়েছে, দেশটির সীমানা কেমন কিংবা জাতীয় পতাকার নকশা কেমন, এসব জানার আগ্রহ তৈরি হতো তার মধ্যে। এক দেশের পতাকার সঙ্গে অন্য দেশের পতাকার মিল ও অমিল খুঁজে দেখতেও ভালো লাগত তার।
দেশের মানচিত্র দেখতে দেখতে একসময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানচিত্র ও পতাকার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে। কোনো দেশের অবস্থান মনে রাখার পাশাপাশি সে চেষ্টা করত দেশটির পতাকার রং, নকশা ও বৈশিষ্ট্য মনে রাখতে। এভাবেই নিজের অজান্তেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে তার জ্ঞান বাড়তে থাকে। ছোটবেলার সেই স্বাভাবিক কৌতূহলই একসময় পরিণত হয় একটি বিশেষ দক্ষতায়। আর সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়েই এবার আন্তর্জাতিক রেকর্ড গড়েছে রাফান।
ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থী রাফান মাশরুর হক সম্প্রতি এসএসসি পাস করেছে। ১৭ বছর বয়সে বিশ্বের ১৯৫টি দেশের পতাকা দেখে সবচেয়ে দ্রুত দেশগুলোর নাম টাইপ করার রেকর্ড গড়েছে সে। স্পোরকল নামের একটি অ্যাপে পতাকা দেখে জাতিসংঘ স্বীকৃত বিশ্বের ১৯৫টি দেশের নাম ল্যাপটপে টাইপ করতে রাফানের সময় লেগেছে মাত্র ৮ মিনিট ১ সেকেন্ড। তার এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে এশিয়া বুক অব রেকর্ডস। গত ১৪ জুলাই এশিয়া বুক অব রেকর্ডস রাফানের রেকর্ডটি নিশ্চিত করে।
রাফানের এই রেকর্ড গড়ার গল্পের শুরু অবশ্য বেশ কয়েক বছর আগে। তখন রেকর্ড গড়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না তার। ছিল শুধু জানার আগ্রহ। ছোটবেলা থেকেই মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বিভিন্ন দেশের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করত সে।
কখনো কোনো দেশের নাম জানতে পারলে মানচিত্রে সেটি খুঁজে দেখত। আবার কোনো পতাকা চোখে পড়লে সেটি কোন দেশের, তা জানার চেষ্টা করত। এভাবে দেশ, মানচিত্র ও পতাকা সম্পর্কে জানার প্রতি তার আগ্রহ ক্রমেই গভীর হতে থাকে।
রাফান জানায়, বিভিন্ন দেশের নাম, অবস্থান ও পতাকা সম্পর্কে জানার কৌতূহল থেকেই সে নিয়মিত মানচিত্র দেখত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে জানার পাশাপাশি পতাকার নকশাগুলোও তার কাছে বেশ আকর্ষণীয় মনে হতো। পরে তার মনে হয়, দীর্ঘদিনের এই আগ্রহকে একটি ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত করা যেতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় পতাকা দেখে দ্রুত দেশের নাম শনাক্ত করার অনুশীলন।
রেকর্ড গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথমেই রাফান এ ধরনের আগের রেকর্ড সম্পর্কে খোঁজ নেয়। কত সময়ে কতটি দেশের নাম শনাক্ত করা হয়েছে, রেকর্ডের জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন এবং নিজের দক্ষতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, এসব বিষয় সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করে সে। এরপর ধীরে ধীরে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করে।
স্পোরকল অ্যাপ হয়ে ওঠে তার অনুশীলনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পতাকা দেখে দ্রুত দেশের নাম শনাক্ত করার অনুশীলন করত রাফান। শুধু সঠিক উত্তর দেওয়াই তার লক্ষ্য ছিল না। একই সঙ্গে কত কম সময়ে সবগুলো দেশের নাম লেখা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে প্রতিবার অনুশীলনের সময় নিজের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করত সে।
শুধু পতাকা চিনতে পারলেই অবশ্য এই রেকর্ড করা সম্ভব নয়। পতাকা দেখে মুহূর্তের মধ্যে দেশ শনাক্ত করার পাশাপাশি সেই দেশের নাম দ্রুত টাইপ করার দক্ষতাও প্রয়োজন। তাই রাফানের প্রস্তুতিতে দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একদিকে বিভিন্ন দেশের পতাকা দ্রুত শনাক্ত করার অভ্যাস তৈরি করা, অন্যদিকে ল্যাপটপে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে দেশের নাম টাইপ করা। বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে এই দুই দক্ষতাকেই একসঙ্গে উন্নত করার চেষ্টা করে সে।
অনুশীলনের সময় কোনো পতাকা দেখে যেন বেশি সময় চিন্তা করতে না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর ছিল রাফানের। পরিচিত পতাকার ক্ষেত্রে দ্রুত উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি যেসব পতাকার নকশা একে অপরের সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে, সেগুলো আলাদা করে মনে রাখার চেষ্টা করত। নিয়মিত অনুশীলনের ফলে ধীরে ধীরে পতাকা দেখার সঙ্গে সঙ্গে দেশের নাম মনে পড়ে যাওয়ার মতো দক্ষতা তৈরি হয় তার।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের গতি আরও বাড়াতে থাকে রাফান। একই পরীক্ষা বারবার দেওয়ার মাধ্যমে কোথায় সময় বেশি লাগছে, কোন দেশগুলোর পতাকা শনাক্ত করতে তুলনামূলক বেশি সময় প্রয়োজন হচ্ছে এবং টাইপ করার সময় কোথায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব বিষয় খেয়াল করত। পরে সেই দুর্বল জায়গাগুলোতে আরও বেশি অনুশীলন করত। এভাবেই ধীরে ধীরে তার প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে রাফান বুঝতে পারে, রেকর্ডের জন্য অংশ নেওয়ার মতো প্রস্তুতি তার হয়েছে। এরপর এশিয়া বুক অব রেকর্ডসে নিবন্ধন করে সে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রেকর্ডের জন্য অংশ নিয়ে বিশ্বের ১৯৫টি দেশের পতাকা দেখে সেগুলোর নাম টাইপ করে মাত্র ৮ মিনিট ১ সেকেন্ডে কাজটি সম্পন্ন করে। এই সময়ের মধ্যেই সব দেশের নাম নির্ভুলভাবে টাইপ করার মাধ্যমে নতুন রেকর্ড গড়ে সে।
গত ১৪ জুলাই এশিয়া বুক অব রেকর্ডস রাফানের এই কৃতিত্ব নিশ্চিত করে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে এমন একটি আন্তর্জাতিক রেকর্ড অর্জন তার জন্য যেমন বড় সাফল্য, তেমনি তার দীর্ঘদিনের আগ্রহ ও পরিশ্রমেরও স্বীকৃতি।
রাফানের এই অর্জনের পেছনে কোনো বিশেষ কোচিং কিংবা ছোটবেলা থেকে রেকর্ড গড়ার পরিকল্পনা ছিল না। বরং একটি সাধারণ কৌতূহল থেকেই তার এই পথচলা শুরু হয়েছিল। মানচিত্র দেখতে ভালো লাগা, বিভিন্ন দেশের অবস্থান জানতে চাওয়া এবং পতাকার নকশা মনে রাখার অভ্যাস ধীরে ধীরে তাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে সেই জ্ঞান ও আগ্রহই হয়ে উঠেছে একটি বিশেষ দক্ষতা।
তার গল্পে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়ার পর সেটিকে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে দক্ষতায় পরিণত করা যায়, রাফানের অর্জন তারই উদাহরণ। শুধু বিশ্বের দেশগুলোর নাম জানা কিংবা পতাকা চেনাই তার লক্ষ্য ছিল না। নিজের জানা বিষয়টিকে দ্রুততার সঙ্গে কাজে লাগানোর জন্য সে অনুশীলন করেছে। প্রতিবার আগের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করেছে। সেই ধারাবাহিক অনুশীলনই শেষ পর্যন্ত তাকে রেকর্ডের জায়গায় নিয়ে গেছে।
ছোটবেলায় মানচিত্রের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকানো থেকেই শুরু হয়েছিল রাফানের এই যাত্রা। তখন হয়তো সে জানত না, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পতাকা নিয়ে তার এই আগ্রহ একদিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেবে। কিন্তু কৌতূহলকে ধরে রাখা, নতুন কিছু জানার চেষ্টা করা এবং সেই জ্ঞানকে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে দক্ষতায় পরিণত করার ফলেই আজ সে রেকর্ডধারী।
বিশ্বের ১৯৫টি দেশের পতাকা দেখে মাত্র ৮ মিনিট ১ সেকেন্ডে সেগুলোর নাম টাইপ করার রেকর্ড তাই শুধু দ্রুততার একটি অর্জন নয়। এটি রাফানের দীর্ঘদিনের কৌতূহল, শেখার আগ্রহ, নিয়মিত অনুশীলন এবং নিজের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার মানসিকতারও একটি স্বীকৃতি।

