দেশের মোবাইল অপারেটররা গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা দিচ্ছে কি না, সেটি পর্যবেক্ষণে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম কিনেছিল টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। খরচ হয়েছিল ১৫ লাখ ইউরো (বর্তমান হিসাবে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা)। চার বছর পেরিয়ে গেলেও অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি তারা।
কল ড্রপ, ভয়েস কোয়ালিটি, ইন্টারনেটের গতি ও নেটওয়ার্ক কভারেজ পরিমাপে জার্মানির তৈরি এই সিস্টেম কেনে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে এটি উদ্বোধন করা হয়। তখন সংস্থাটি বলেছিল, গ্রাহকদের আরও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে এটি সাহায্য করবে।
সারা দেশে বেশ কয়েকবার ‘ড্রাইভ টেস্ট’ বা মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালালেও এখনো চূড়ান্ত ফলাফল দিতে পারেনি কমিশন। নথিপত্র বলছে, বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত তিনটি বড় পরীক্ষা চালিয়েছে বিটিআরসি। তবে তাদের পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্য আছে। এ নিয়ে অপারেটরদের আপত্তি আছে।
বিটিআরসি এখন বলছে, পরীক্ষা পদ্ধতির মাপকাঠি ঠিক করতে তারা অপারেটরদের সঙ্গে কাজ করছে। এরপর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রাহকদের মানসম্মত মোবাইল সেবা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিয়মিত এ ধরনের পরীক্ষা করে। এসব পরীক্ষায় মূলত কল ড্রপ, ভয়েস কোয়ালিটি, ইন্টারনেটের গতি এবং নেটওয়ার্ক কভারেজ যাচাই করা হয়। এর মাধ্যমে সেবার মান যাচাইয়ের পাশাপাশি অপারেটরদের কোথায় নেটওয়ার্ক উন্নত করা প্রয়োজন, তা–ও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
নতুন এই সিস্টেম কেনার আগে বিটিআরসি বছরে কয়েকবার তাদের ওয়েবসাইটে কল ড্রপসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করত।
বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটরদের তথ্যের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি স্বীকার করেছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী। তিনি বলেন, আমরা একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে চাই, যাতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া যায়।
নতুন সিস্টেম ব্যবহার করে প্রথম বড় পরীক্ষাটি চালানো হয় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ জুনের মধ্যে। ঢাকা সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও সাভারে এই পরীক্ষা চলে। এতে সেবার মানের ৪০টি সূচক যাচাই করা হয়।
দেশে মোট মোবাইল গ্রাহক ১৮ কোটি ৬০ লাখ। এর মধ্যে ৫ কোটি ৭৪ লাখ গ্রাহক রয়েছে রবির। পরীক্ষায় রবি পাঁচটি সূচকে অকৃতকার্য হয়। ৮ কোটি ৫৫ লাখ গ্রাহক থাকা গ্রামীণফোন অকৃতকার্য হয় ছয়টি সূচকে। অন্যদিকে বাংলালিংক ১৪টি এবং টেলিটক ২৬টি সূচকে ব্যর্থ হয়।
টেলিটকের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৬৮ লাখ। ইন্টারনেট সেবার মানদণ্ড পূরণে একমাত্র টেলিটকই ব্যর্থ হয়।
ঢাকায় কল ড্রপের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে বাংলালিংক। কেরানীগঞ্জ ও সাভারে কল সেটআপ টাইম (সংযোগের সময়) এবং সেবার মান নিয়ে সব অপারেটরই ভুগেছে। টু-জি এবং ফোর-জি ভয়েস সেবার সূচকেও তারা ব্যর্থ হয়েছে।
ওই সময় রবি ও বাংলালিংক দাবি করে, বিটিআরসির যন্ত্রপাতির ফলাফলের সঙ্গে তাদের নিজস্ব পরীক্ষার ফলাফলে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মাধ্যমে তারা এ বিষয়ে আপত্তি জানায়।
তখন এক বিবৃতিতে রবি বলেছিল, ড্রাইভ টেস্টের ফলাফলের বিষয়ে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব বলে আশাবাদী।
গ্রামীণফোনের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, অপারেটরদের ফলাফল এবং বিটিআরসির ফলাফলের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। তাই সূচক গণনার একটি সমন্বিত পদ্ধতি বের করতে অ্যামটব, বিটিআরসি এবং ড্রাইভ টেস্ট ভেন্ডররা একসঙ্গে কাজ করছে।
তবে পরে আরও দুই দফা পরীক্ষার পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অপারেটররা কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। গত বছরের শেষের দিকে এক পরীক্ষায় বিটিআরসির পরিদর্শকেরা দেখেন, ফোর-জি কভারেজ নিয়ে অপারেটরদের দাবির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃত সেবার মানের বড় ব্যবধান রয়েছে।
টাঙ্গাইল, বগুড়া, গাইবান্ধা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুরের শহর এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওই পরীক্ষা চলে। পরিদর্শক দল দেখতে পায়, এসব এলাকায় ফোর-জি সিগন্যাল দুর্বল বা একেবারেই নেই। এ ছাড়া ঘন ঘন কল ড্রপ, ঘরের ভেতরে দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং লোডশেডিংয়ের সময় নেটওয়ার্ক না থাকার প্রমাণও পায় তারা।
সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ ও ১৬ এপ্রিল চালানো পরীক্ষায় গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক—সবার ক্ষেত্রেই কল ড্রপের হার পাওয়া যায় ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেঁধে দেওয়া সীমার চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে নেটওয়ার্কের মানের দিক থেকে বরাবরই পিছিয়ে থাকা টেলিটকের কল ড্রপ পাওয়া যায় শূন্য শতাংশ।
একই রকম কল ড্রপের ফলাফলের বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, সংখ্যাগুলো কেন হুবহু এমন হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত বছরের শেষে এবং সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারের কথা হয় বেশ কয়েকজন মোবাইল ব্যবহারকারীর সঙ্গে। তারা জানান, কল ড্রপ, ঘরের ভেতরে দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেটে ধীরগতি এখন নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা জানান, ঘরের ভেতরে তারা প্রায়ই নেটওয়ার্ক পান না।
ঢাকার বাসিন্দা মো. নাবিদ বলেন, ঘন ঘন কল ড্রপ হয়। তিনি বলেন, ‘এর ওপর কখনো কখনো অপর প্রান্তের কথা শোনা গেলেও আমার কথা শোনে না। এর বিপরীত ঘটনাও ঘটে। অনেক সময় দুজনই হ্যালো হ্যালো করতে থাকি, কিন্তু কেউ কারও কথা শুনতে পাই না।’
সার্কুলার রোডের বাসিন্দা নুমান আহমেদ রবি ও বাংলালিংক ব্যবহার করেন। তিনি জানান, ঘরের ভেতরে কোনো নেটওয়ার্কই ঠিকমতো কাজ করে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার শারমিন আহমেদ বলেন, প্রতি সপ্তাহে তার দুই-তিনটি কল ড্রপ হয়। তিনি বলেন, বেশির ভাগ সময় আমি কথা বলার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করি। সেটাও সব সময় ঠিকমতো কাজ করে না।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী বলেন, পরিমাপ পদ্ধতি নিয়ে শিল্প খাত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে একটি স্পষ্ট ও প্রমিত নিয়ম চালুর চেষ্টা চলছে। যেহেতু মতপার্থক্য রয়েছে এবং ফলাফল এখনো চূড়ান্ত নয়, তাই এই মুহূর্তে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
শিগগিরই ওয়েবসাইটে ড্রাইভ টেস্টের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, সিস্টেম চালুর চার বছর পরও চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে না পারাটা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতার অভাবকেই তুলে ধরে।
তিনি বলেন, জনগণের করের টাকায় এসব সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। তাই এগুলো কেন সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না, তা তদন্ত করে দেখা উচিত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

