নেইমারের নাম ঘোষণা হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা হল, উঠে স্লোগান। আবেগের স্রোতে বাধ্য হয়ে কার্লো আনচেলত্তিকে থামতে হয় খানিকটা। এই মুহুর্তের জন্য নেইমার তো বটেই তার ভক্তদের জন্য ছিলো দীর্ঘ প্রতিক্ষা। বিশ্বকাপের দল ঘোষণায় নেইমার যেমন আলোড়ন তুলেছেন গোটা ফুটবল বিশ্বই যেন তার দিকে তাকিয়ে।
প্রায় তিন বছর ধরে নেইমার দূর থেকে ব্রাজিলের খেলা দেখেছেন। চোটের আঘাত, হতাশা আর অনিশ্চয়তা তাকে ঘিরে ধরেছিল। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তিনি আর কখনো ব্রাজিলের সেই বিখ্যাত হলুদ জার্সি গায়ে জড়াতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল বড় সংশয়।
সব ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা অবশেষে জাতীয় দলে এক আবেগঘন প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন করেছেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের দলে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন এই তারকা। এটি হতে যাচ্ছে নেইমারের চতুর্থ বিশ্বকাপ। তবে তার ফেরার এই পথটা মোটেও সহজ ছিল না।
যে চোট বদলে দিল সবকিছু
সবকিছু ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল মন্টেভিডিওতে, উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে। ব্রাজিল সেই ম্যাচে ২-০ গোলে হেরেছিল, তবে সেই হারের চেয়েও বড় আঘাত হয়ে আসে নেইমারের চোট। বাম হাঁটুর ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট (এসিএল) এবং মেনিস্কাস ছিঁড়ে যাওয়ায় চোখে জল নিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি।
সে সময় আল হিলালের হয়ে খেলছিলেন নেইমার। এই চোট তাকে ২০২৪ কোপা আমেরিকা থেকে ছিটকে দেয় এবং তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। মাঠের লড়াইয়ে ফিরতে তার সময় লাগে দীর্ঘ ৩৭০ দিন। ফেরার পর আবেগাপ্লুত নেইমার বলেছিলেন, ‘জীবনে আমি সবচেয়ে বেশি যা চাই, তা হলো ফুটবল খেলা। মাঠের বাইরে থাকা প্রতিটি দিন আমি যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছি।’
সান্তোসে ঘরে ফেরা ও নতুন রূপ
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেইমার এমন এক সিদ্ধান্ত নেন, যা তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি ফিরে আসেন শৈশবের ক্লাব সান্তোসে এফসিতে। বার্সেলোনা, পিএসজি আর আল হিলালের চাকচিক্য ছেড়ে চেনা পরিবেশে আসেন কেবল নিজের ছন্দ আর আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার আশায়।
তবে শুরুটা মসৃণ ছিল না। পেশির চোটের কারণে বারবার ছন্দপতন হচ্ছিল। তৎকালীন কোচ দরিভাল জুনিয়র তাকে দলে ডাকলেও চোটের কারণে তিনি নাম প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। সান্তোস যখন অবনমনের ঝুঁকিতে, তখন নেইমারকে নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হয়।
ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে আসেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। শেষ চার ম্যাচে ৫ গোল আর ১ অ্যাসিস্ট করে সান্তোসকে অবনমন থেকে রক্ষা করেন এবং কোপা সুদামেরিকানায় খেলার যোগ্যতা এনে দেন। এই পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যে, নেইমারের জাদু এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
আনচেলত্তির সঙ্গে দূরত্ব ও ড্রেসিংরুমের সেই ভিডিও
২০২৫ সালের মে মাসে কার্লো আনচেলত্তি ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর নেইমারের দলে ফেরা নিয়ে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়। সান্তোসে ভালো খেললেও আনচেলত্তি তাকে দলে নিচ্ছিলেন না। নেইমার তখন বলেছিলেন, ‘আমার খেলার ধরন সবাই জানে। কাউকে কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন আমার নেই।’ অন্যদিকে আনচেলত্তির যুক্তি ছিল, ‘নেইমারের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই, তবে বিশ্বকাপে খেলার মতো শারীরিক তীব্রতা তার প্রয়োজন।’
এই দূরত্বের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সান্তোসের ড্রেসিংরুমে ম্যাসাজ টেবিলে শুয়ে নেইমার দেখছিলেন আনচেলত্তির দল ঘোষণা। নিজের নাম না দেখে তিনি হেসে টিভির দিকে তাকিয়ে রসিকতা করে বলেন, ‘আর আমি, আনচেলত্তি?’ এই ভিডিওতে যেমন তার হতাশা ছিল, তেমনি ছিল ফেরার জেদও।
অবশেষে বিশ্বকাপের ডাক
শেষ পর্যন্ত নেইমারের ধারাবাহিকতাই সব হিসাব বদলে দেয়। পুরো মরশুম জুড়ে নেইমারের পারফরম্যান্স নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর আনচেলত্তি ও তার কোচিং স্টাফ নিশ্চিত হন যে, নেইমার শারীরিকভাবে প্রস্তুত।
রিও ডি জেনিরোতে যখন ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করা হয়, সেখানে সগৌরবে ছিল নেইমারের নাম। এই ঘোষণা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মধ্যে উল্লাসের বন্যা বইয়ে দেয়। আনচেলত্তি বলেন, ‘নেইমার ধারাবাহিকভাবে খেলছেন এবং ভালো শারীরিক অবস্থায় আছেন। এই বিশ্বকাপে তিনি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।’
কোচের বিশ্বাস, নেইমারের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব ড্রেসিংরুমের পরিবেশ আরও ভালো করবে।
শেষ মিশন
নেইমারের জন্য এই বিশ্বকাপ কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি তার ক্যারিয়ারের শেষ অপূর্ণতা ঘোচানোর মঞ্চ। ক্লাব ফুটবলে ইউরোপ-আমেরিকা জয় করেছেন, দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোল করেছেন; কিন্তু একটি বিশ্বকাপ ট্রফি এখনও তার অধরা।
এই এক সোনালী ট্রফির খোঁজে তিনি অস্ত্রোপচার, পুনর্বাসন ও সমালোচনার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। সান্তোসে ফিরে নিজেকে নতুন করে চেনা এই তারকার সামনে এখন সুযোগ এসেছে নিজের রূপকথাকে পূর্ণতা দেওয়ার।

