ইবোলায় কঙ্গোতে ৮৮ জনের মৃত্যু, বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা ডব্লিউএইচও’র

মধ্য আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাবে ৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক আকার ধারণ করায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি আফ্রিকা) শনিবার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সংক্রামক এই রক্তক্ষরণজনিত জ্বরে ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩৩৬টি সন্দেহজনক সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।

জেনেভাভিত্তিক ডব্লিউএইচও আজ রোববার ভোরে এক বিবৃতিতে জানায়, ইবোলার ‘বুন্ডিবুগিও’ ধরনের এই প্রাদুর্ভাব আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির আওতায় ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি ডব্লিউএইচও’র সতর্কতার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর।

সংস্থাটি জানিয়েছে, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা ও সংক্রমণের বিস্তার এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে ২০২৪ সালে চালু হওয়া সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘মহামারি অবস্থা’ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, তারা বড় পরিসরে জরুরি সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংস্থাটি দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়াকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছে।

ডিআর কঙ্গোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল-রজার কাম্বা বলেছেন, ‘বুন্ডিবুগিও ধরনের ইবোলার কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এই ধরনের মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।’

২০০৭ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ধরনের ইবোলায় প্রতিবেশী উগান্ডাতেও একজন কঙ্গোলিজ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে বলে শনিবার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।

বর্তমানে শুধু ‘জাইর’ ধরনের ইবোলার টিকা রয়েছে। ১৯৭৬ সালে শনাক্ত হওয়া এই ধরনটির মৃত্যুহার ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা শুক্রবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে সর্বশেষ প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত করেন। অঞ্চলটি উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সীমান্তঘেঁষা।

স্থানীয় নাগরিক প্রতিনিধি আইজ্যাক নিয়াকুলিন্দা এএফপিকে ফোনে বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহ ধরে মানুষকে মরতে দেখছি। আক্রান্তদের আলাদা করে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা বাড়িতেই মারা যাচ্ছে, আর পরিবারের সদস্যরাই মরদেহ স্পর্শ করছেন।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাম্বা জানান, প্রথম শনাক্ত রোগী ছিলেন একজন নার্স। তিনি গত ২৪ এপ্রিল ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইবোলাসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আসেন।

ইবোলার উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, রক্তক্ষরণ ও বমি।

এমএসএফের জরুরি কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ট্রিশ নিউপোর্ট বলেন, ‘অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা, একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এবং সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণ পৌঁছে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।’

এক কোটির বেশি জনসংখ্যার ডিআর কঙ্গো আয়তনে ফ্রান্সের প্রায় চার গুণ হলেও দেশটির যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল। ফলে চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

এটি ডিআর কঙ্গোতে ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব। কর্মকর্তারা বলছেন, সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তবে সংস্থাটি বলেছে, প্রাথমিক নমুনায় উচ্চ সংক্রমণ হার, দুই দেশে সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকা—সব মিলিয়ে বর্তমানে শনাক্ত সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

গত আগস্টে দেশটির মধ্যাঞ্চলে সর্বশেষ ইবোলা প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই ঘটনায় অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পরে ডিসেম্বরে সেটি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে ঘোষণা করা হয়।

২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

বাদুড় থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা ইবোলা ভাইরাসে তীব্র রক্তক্ষরণ ও অঙ্গ বিকল হতে পারে। ডব্লিউএইচও’র তথ্য অনুযায়ী, গত অর্ধশতকে বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মৃত্যুহার ছিল ২৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে।

সংক্রমিত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থ বা রক্তের সংস্পর্শে এ ভাইরাস ছড়ায়। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন। ভাইরাসটির সুপ্তিকাল সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে।

Related Articles

Latest Posts