গাঁজা ব্যবহার করে উৎপাদিত কিছু পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং দ্রুতই এই মাদককে কম বিপজ্জনক হিসেবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাসে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে)। এটি যুক্তরাষ্ট্রের মাদক নীতিতে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় পরিবর্তন।
রয়টার্স বলছে, এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গাঁজা বৈধ হয়ে যাচ্ছে না, তবে এটি ৪৭ বিলিয়ন ডলারের এই শিল্পকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। কারণ ফেডারেল পর্যায়ে নানা বাধার মুখে থাকা সত্ত্বেও প্রায় সব অঙ্গরাজ্য কোনো না কোনোভাবে চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য গাঁজাকে বৈধ করেছে এবং প্রায় অর্ধেক অঙ্গরাজ্যে বিনোদনমূলক ব্যবহারও বৈধ।
রাজ্য-নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসায় ব্যবহৃত গাঁজাজাত পণ্যগুলোকে এখন অত্যন্ত আসক্তিকর মাদকের তালিকা (যেমন: হেরোইন) থেকে সরিয়ে এমন একটি শ্রেণিতে নেওয়া হবে, যেখানে অপব্যবহারের ঝুঁকি কম বা মাঝারি, যেমন: সাধারণ ব্যথানাশক, কেটামিন ও টেস্টোস্টেরন। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) অনুমোদিত গাঁজাজাত পণ্যও একই শ্রেণিতে যাবে।
ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, ‘সরকার গাঁজার সব ধরনের ব্যবহারের ক্ষেত্রেই কম বিপজ্জনক হিসেবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের বৃহত্তর উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নেবে।’
এই পদক্ষেপ গবেষণার বাধা কমাবে, করের চাপ হালকা করবে এবং কোম্পানিগুলোর জন্য অর্থায়ন পাওয়া সহজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের ফলে গাঁজার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করা সম্ভব হবে, যা রোগীদের উন্নত চিকিৎসা এবং চিকিৎসকদের আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে সহায়তা করবে।’
এই সিদ্ধান্ত এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডিসেম্বরের এক নির্বাহী আদেশের পর, যেখানে বিচার বিভাগকে গাঁজার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত বর্ধনশীল ক্যানাবিস শিল্প লাভবান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্যানোপি গ্রোথ, টিলরে ব্র্যান্ডস এবং ট্রুলিভ ক্যানাবিসের মতো কোম্পানিগুলো এর সুফল পেতে পারে।
চিকিৎসায় ব্যবহৃত গাঁজা ও ভোগ্যপণ্য বিক্রির পাশাপাশি এসব কোম্পানি ব্যথা নিরাময়, ক্যানসারের উপসর্গ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ততাসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও গবেষণা করছে।
শেয়ারবাজারে উত্থান, পরে পতন
এই সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত ক্যানাবিস কোম্পানিগুলোর শেয়ার ৬ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল, তবে পরে তা আবার কমে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের সীমিত প্রভাব বিবেচনায় নেন।
টিলরে ব্র্যান্ডসের প্রধান নির্বাহী আরউইন সাইমন বলেন, ‘আজ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে ফেডারেল নীতি অবশেষে বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং রোগীর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে।’
গাঁজাকে দীর্ঘদিন ধরে ‘শিডিউল-১’ মাদক হিসেবে রাখা হয়েছিল, যার অর্থ এটি অত্যন্ত আসক্তিকর এবং এর কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা ব্যবহার নেই। এই অবস্থানকে অনেকেই পুরোনো ও অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করেছেন, বিশেষ করে যখন রাজ্য পর্যায়ে এর বৈধতা বাড়ছে।
কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২৪টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে বিনোদনমূলক গাঁজা বৈধ, ৪০টি অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসায় ব্যবহার পুরোপুরি বৈধ এবং আরও ৮টিতে আংশিক বৈধ। কেবল আইডাহো ও কানসাসে কোনো ধরনের বৈধ ব্যবহার নেই।
বাজার গবেষণা সংস্থা বিডিএসএ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গাঁজার বৈধ বিক্রি ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে।
ডিসেম্বরে ট্রাম্পের নির্দেশের পর মেডিকেয়ার সুবিধাভোগীদের মধ্যে কিছু মানুষকে চিকিৎসকের পরামর্শে হ্যাম্পজাত পণ্য, যেমন: সিবিডি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি কংগ্রেসকে আহ্বান জানান আইন হালনাগাদ করে পূর্ণাঙ্গ সিবিডি পণ্যের অ্যাক্সেস নিশ্চিত করতে, তবে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আছে এমন পণ্যের বিক্রি সীমিত রাখতে।
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অবৈধ মাদক
গাঁজা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অবৈধ মাদক। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (সিডিসি) অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজনের একজন বছরে অন্তত একবার এটি ব্যবহার করেন।
এদিকে দেশটিতে লাখ লাখ মানুষ গাঁজা রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন, যদিও একই সময়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো গাঁজাজাত পণ্য বিক্রি করছে।
২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসনও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল, তবে তা চূড়ান্ত হয়নি এবং ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পর ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) সেই প্রচেষ্টা বাতিল করে।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ২৯ জুন থেকে গাঁজার পুনঃশ্রেণিবিন্যাস নিয়ে প্রমাণ ও বিশেষজ্ঞ মতামত সংগ্রহ শুরু হবে।
সমালোচকরা বলছেন, গাঁজা বৈধ হলে কিশোরদের মধ্যে ব্যবহার বাড়তে পারে, কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমতে পারে এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডিসেম্বরে ট্রাম্পের নির্দেশের সময় কংগ্রেসের অনেক রিপাবলিকান আপত্তি জানিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম থাকলেও আরকানসাসের সিনেটর টম কটন বলেন, এই পদক্ষেপে ‘বিপজ্জনক’ একটি মাদক ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।
তিনি বলেন, ‘আজকের গাঁজা ১০–২০ বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, যা মানসিক বিকার, সামাজিক সমস্যা এবং প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। গাঁজার শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তন ভুল পথে পদক্ষেপ।’

