যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কি এলাকার বাসিন্দা উইলিয়াম নিল ম্যাকক্যাসল্যান্ড গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ফোন, চশমাসহ প্রয়োজনীয় ডিভাইস বাড়িতে রেখেই বের হন।
এখন পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের পরই পুরো এলাকায় ড্রোন ও কুকুর ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালায় স্থানীয় পুলিশ। তবে তেমন কিছুই খুঁজে পাননি তারা।
এমনকি তিনি কোথায় গিয়েছেন, কেন চলে গেছেন বা এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কিনা—এখন পর্যন্ত এমন প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
৬৮ বছর বয়সী ম্যাকক্যাসল্যান্ডের এই হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নের পেছনে রয়েছে তার কাজ বা পেশা।
পেন্টাগনের সবচেয়ে উন্নত মহাকাশ গবেষণার সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কাজ করতেন ম্যাকক্যাসল্যান্ড। একসময় রাইট-প্যাটারসন বিমান ঘাঁটিতে এয়ার ফোর্স রিসার্চ ল্যাবরেটরির কমান্ডে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনী এই মেজর জেনারেল।
তার নিখোঁজের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অনলাইনে নানা জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে।
অনেকেরই ধারণা, মার্কিন সরকারের ইউএফও বা অজানা উড়ন্ত বস্তু সংক্রান্ত নথি নিয়ে একটি বেসরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
যদিও তার স্ত্রী সুসান ম্যাকক্যাসল্যান্ড ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব ধারণা নাকচ করে দেন। নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে ইউএফও’র কোনো সংযোগ নেই বলে জানান তিনি।
নিউ মেক্সিকোর একই এলাকায় আরও একজনের সন্ধান করছে পুলিশ।
৪৮ বছর বয়সী স্টিভেন গার্সিয়া গত বছরের আগস্ট থেকে নিখোঁজ। আলবুকার্কিতে ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে সম্পত্তি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
নিউ মেক্সিকোতে আরও দুজন নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন—মেলিসা ক্যাসিয়াস ও অ্যান্থনি শ্যাভেজ, কাজ করতেন শীর্ষ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র ‘লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি’তে।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাড়িতে ৬৭ বছর বয়সে গুলিতে নিহত হন কার্ল গ্রিলমায়ার। এই জ্যোতির্পদার্থবিদ ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে কাজ করতেন এবং নাসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সিএনএন, সিবিএস, ফক্স নিউজসহ মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারমাণবিক ও মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এমন অন্তত ১০ জন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন বা মারা গেছেন।
হত্যাকাণ্ড কিংবা নিখোঁজের এসব সমাধান না হওয়া ঘটনার সবগুলোর প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্রও খুঁজে পায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধের কোনো চিহ্ন পায়নি পুলিশ।
অন্তত দুটি ক্ষেত্রে পরিবারগুলো আগের কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত টানাপোড়নকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইনে এ ঘটনাগুলো নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ, প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এসব ঘটনার তদন্ত করছে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।
এফবিআই ডিরেক্টর কাশ প্যাটেল বলেন, ‘আমরা দেখব তাদের কাছে থাকা ক্লাসিফায়েড তথ্য বা বিদেশি কারোও সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না। যদি কোনো নাশকতামূলক কাজ বা ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে এফবিআই যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’
বিজ্ঞানীদের নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ‘সম্ভাব্য অশুভ যোগসূত্রের প্রশ্ন তোলে’ বলে জানিয়েছে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত হাউস ওভারসাইট কমিটি।
এসব ব্যক্তিদের কাছে স্পর্শকাতর বৈজ্ঞানিক তথ্য ছিল উল্লেখ করে তারা এই মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনাগুলো তদন্ত করবে বলে জানিয়েছে।
কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান জেমস কোমার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এগুলো কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কংগ্রেস এ বিষয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আমাদের কমিটি এখন এসব ঘটনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কারণ আমরা এটাকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখছি।’
কমিটির সদস্য জেমস ওয়াকিনশ সিএনএনকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ আছেন। এটি এমন কোনো প্রোগ্রাম নয় যে ১০ জনকে লক্ষ্যবস্তু করে কোনো বিদেশি শত্রু বড় প্রভাব ফেলতে পারবে।’
বিষয়টি নিয়ে এফবিআই, প্রতিরক্ষা বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ ও নাসার কাছে জবাব চেয়েছে হাউস কমিটি।
প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, তারা সরাসরি কমিটিকে উত্তর দেবে এবং জ্বালানি বিভাগ প্রশ্নগুলো হোয়াইট হাউসের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে।
নাসা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে জানিয়েছে, তারা বিজ্ঞানীদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা করছে।
নাসার মুখপাত্র বেথানি স্টিভেন্স বলেন, ‘এই মুহূর্তে নাসার সঙ্গে সম্পর্কিত এমন কিছু নেই যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।’
শুরু যেভাবে
প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও, রহস্যময় মৃত্যু ও নিখোঁজের এই ধারা শুরু হয় ২০২৩ সালে মাইকেল ডেভিড হিকসের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তিনি প্রায় ২৫ বছর নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরিতে (জেপিএল) কাজ করেছিলেন।
৫৯ বছর বয়সী হিকস ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই মারা যান। তবে তার মৃত্যুর কারণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি জানায়, জেপিএলে ধূমকেতু ও গ্রহাণু বিশেষজ্ঞ ছিলেন হিকস।
হিকসের মেয়ে জুলিয়া হিকস সিএনএনকে বলেন, ‘বর্তমানের এই জল্পনায় বিচলিত আমি। বাবার মৃত্যুর সঙ্গে অন্য নিখোঁজ বিজ্ঞানীদের কী সম্পর্ক তা আমি বুঝতে পারছি না।’
পরবর্তী বছরগুলোতে জেপিএলের সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
২০২৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে মারা যান মহাকাশ গবেষণা বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাঙ্ক মাইওয়াল্ড (৬১)।
গত বছরের জুনে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি বনে হাইকিং করতে গিয়ে নিখোঁজ হন ৬০ বছর বয়সী অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার মনিকা রেজা। তিনি নাসা ল্যাবের মেটেরিয়ালস প্রসেসিং গ্রুপের ডিরেক্টর ছিলেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর মৃত্যুর ঘটনা রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এমআইটির অধ্যাপক নুনো এফজি লরেইরো নিজ বাড়িতে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন। ৪৭ বছর বয়সী এই পদার্থবিদ এমআইটির প্লাজমা সায়েন্স অ্যান্ড ফিউশন সেন্টারের নেতৃত্বে ছিলেন।
২০২৪ সালে মারা যান সাবেক মার্কিন বিমান বাহিনী গোয়েন্দা কর্মকর্তা ম্যাথু জেমস সুলিভান (৩৯)। ইউএফও সংক্রান্ত একটি ফেডারেল হুইসেলব্লোয়ার মামলায় তার সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল।
রিপাবলিকান প্রতিনিধি এরিক বার্লিসন সুলিভানের মৃত্যুকে ‘সন্দেহজনক আত্মহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।
সম্প্রতি এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে ২০২২ সালে আলাবামার ইনস্টিটিউট ফর এক্সোটিক সায়েন্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যামি এসক্রিজের মৃত্যুর বিষয়টিও সামনে এসেছে।
হোয়াইট হাউস গত সপ্তাহে জানিয়েছে, এই ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে ‘বেশ গুরুতর ব্যাপার’ বলে উল্লেখ করেছেন।
গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করব এগুলো সাধারণ ঘটনা। তবে আগামী দেড় সপ্তাহের মধ্যে আমরা সব জানতে পারব।’

