প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলকে ১৫ বছর নেতৃত্ব দেওয়ার পর প্রধান নির্বাহীর পদ ছাড়ছেন টিম কুক। তার স্থলাভিষিক্ত হবেন জন টার্নাস।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ১ সেপ্টেম্বর কুকের স্থলাভিষিক্ত হবেন টার্নাস। একই দিন থেকে তিনি অ্যাপলের পরিচালনা পর্ষদেও (বোর্ডে) যোগ দেবেন। অন্যদিকে, টিম কুক অ্যাপলের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সিএনএন জানায়, গত এক বছর ধরেই অ্যাপলের পরবর্তী সিইও হিসেবে জন টার্নাসের নাম আলোচনায় ছিল।
স্টিভ জবস এবং টিম কুকের পর অ্যাপলের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হতে যাচ্ছেন জন টার্নাস।
জন টার্নাস প্রায় ২৫ বছর ধরে অ্যাপলে কর্মরত। অ্যাপলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ‘ভার্চুয়াল রিসার্চ সিস্টেমস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
রয়টার্স জানায়, ২০০১ সালে তিনি অ্যাপলের প্রোডাক্ট ডিজাইন টিমে যোগ দেন। পরে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৩ সালে হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ২০২১ সালে তিনি কোম্পানির এক্সিকিউটিভ টিমে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে টার্নাসের বয়স ৫০ বছর। ২০১১ সালে স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর টিম কুক যখন সিইও হন, তখন তার বয়সও ছিল ৫০ বছর।
দীর্ঘ কর্মজীবনে অ্যাপলের প্রায় সব বড় পণ্যের পেছনেই টার্নাসের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাক, অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস এবং অ্যাপল ভিশন প্রো-এর মতো পণ্যের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তার অন্যতম বড় সাফল্য হলো, ম্যাক কম্পিউটারকে ইন্টেল প্রসেসর থেকে সরিয়ে অ্যাপলের নিজস্ব সিলিকন চিপে রূপান্তর। ম্যাকের বিক্রি বাড়াতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ‘আইফোন ১৭’ লাইনআপ, নতুন ‘ম্যাকবুক নিও’ এবং ২০১৭ সালের পর আইফোনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে পরিচিত ‘আইফোন এয়ার’—এসব প্রকল্পেও তার দলের বড় ভূমিকা ছিল।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে টিম কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্বের প্রথম কোম্পানি হিসেবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যায়নে পৌঁছানোর পর এখন এটি প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান।
জন টার্নাস এক বিবৃতিতে টিম কুককে নিজের ‘মেন্টর’ বা পরামর্শদাতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, স্টিভ জবস ও টিম কুকের অধীনে কাজ করতে পারা তার জন্য বড় সৌভাগ্যের বিষয়।
টিম কুকও টার্নাসকে অ্যাপলের ভবিষ্যতের জন্য ‘সঠিক ব্যক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বলে জানায় বিবিসি। কুক তাকে ‘দূরদর্শী’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তার মধ্যে ‘একজন ইঞ্জিনিয়ারের মস্তিষ্ক, একজন উদ্ভাবকের আত্মা এবং সততা ও সম্মানের সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানসিকতা রয়েছে।’
টিম কুক অ্যাপলকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করলেও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে—এমন সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে গুগল, মাইক্রোসফট ও মেটার তুলনায় অ্যাপল ধীরগতির। ফলে তাদের গুগল ও ওপেনএআইয়ের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষক ড্যান আইভস সিএনএনকে বলেন, এআই ক্ষেত্রে সফল হতে টার্নাসের ওপর বড় চাপ থাকবে।
ফরেস্টারের বিশ্লেষক দীপনঞ্জন চ্যাটার্জি বলেন, টার্নাস যেহেতু হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, তাই তিনি অ্যাপলের পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারেন এবং সেখানে এআই অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপলকে এখন শুধু আইফোননির্ভরতা কমিয়ে ফোল্ডেবল ফোন বা পরিধানযোগ্য স্মার্ট চশমার মতো নতুন উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে, হার্ডওয়্যারের ঐতিহ্য ও আধুনিক এআই প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে অ্যাপলের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই হবে নতুন সিইও জন টার্নাসের প্রধান লক্ষ্য।

