পোপ বনাম প্রেসিডেন্ট: নতুন সংকটে ট্রাম্প?

তারা দুইজনই মার্কিনি। একজন ক্ষমতাধর। অন্যজন প্রভাবশালী। একজনের হাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনী। অন্যজন নেতৃত্ব দেন প্রায় ১৫০ কোটি ভক্তের।

তাদের দুইজনের জন্ম একই দেশে। ভাষা এক। একে অপরের শব্দচয়ন-উচ্চারণ সবই বোঝেন। দুইজনেই একই দলের সমর্থক; তবুও দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।

শুধু দ্বন্দ্ব নয়। ইতিহাস সৃষ্টিকারী দ্বন্দ্ব।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য: দুই বিশ্বনেতার এমন ‘কথা ছোড়াছুড়ি’ যেমনই অভূতপূর্ব, তেমনি অনাকাঙ্ক্ষিত।

পোপ লুই চতুর্দশ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে ও যে ভাষায় কথা বলছেন তা জগৎজুড়ে শুধু বিতর্কই সৃষ্টি করছে না, জন্ম দিচ্ছে অশান্তিও।

গত ১২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প সমাজমাধ্যমে নিজেকে যিশু খ্রিষ্টের ‘বেশে’ উপস্থাপন করেন। এআই দিয়ে তৈরি করা ছবিটিতে ট্রাম্পকে ‘ঐশ্বরিক’ ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে তুলে ধরা হয়। তাকে দেখা যায় এক অসুস্থ ব্যক্তির কপাল স্পর্শ করতে। সুস্থ করার আশায়। পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ইত্যাদি।

পরদিন জনপ্রিয় পডকাস্টার জেনিফার ওয়েলচ বলেন, ‘ইরানের মিনাবের এক বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে শতাধিক শিশু হত্যাকারী ট্রাম্প নিয়েছেন যিশুর বেশ। ধিক, তাকে।’

অন্যদিকে, ট্রাম্পভক্ত ক্যাথলিক উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স বলেছেন—‘ওটা রসিকতা ছিল।’

এরপর, এক সময়ের ট্রাম্পভক্ত উগ্র ডানপন্থি সাবেক কংগ্রেস সদস্য মারজোরি টেইলর গ্রিন বলে বসেন, ‘এটা ধর্ম অবমাননা। ট্রাম্প খ্রিষ্টধর্মের অপমান করেছেন। ট্রাম্প ধর্মদ্রোহী।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ক্যাথলিক ধর্মগুরুদের বলতে শোনা গেল—‘এত নিচুমানের রসিকতা করে ট্রাম্প যেন আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদেরই পরাজয় নিশ্চিত করছেন।’

গত ১৪ এপ্রিল সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—আবারও পোপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ালেন প্রেসিডেন্ট। তবে এবার এটা অন্যরকম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৫ কোটি বাসিন্দার ২০ থেকে ২২ শতাংশ ক্যাথলিক। তাদের প্রায় অর্ধেক ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের ভোট দিয়ে থাকেন।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, তথ্য অনুসারে ৫৫ তেকে ৫৯ শতাংশ ক্যাথলিক মতবাদের মানুষ ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদের ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন।

এতে জানানো হয়—গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ক্যাথলিক একজন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসার ১৭ মাস পর সেই ট্রাম্প আবারও ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু পোপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন।

তবে এবারের সংঘাতের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রচারণার সময় ট্রাম্পের অভিবাসননীতি নিয়ে তৎকালীন পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হয়েছিল।

সেই নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী হলেও, এবার পোপ লিওয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের সংঘাতের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এই সংঘাত দীর্ঘ হওয়ায় আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।

 

নিজেকে পোপের পোশাকে উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সমালোচিত হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ৫ মে বিবিসির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘এআই ছবির মাধ্যমে নিজেকে পোপের বেশে তুলে ধরায় সমালোচিত ট্রাম্প।’

এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুর পর ক্যাথলিক কর্মকর্তারা যখন নতুন পোপ বেছে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন হোয়াইট হাউসের সমাজমাধ্যমে পোপের পোশাক পরা ট্রাম্পের এআই ছবি প্রকাশ করা হয়। 

অনেকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্যাথলিক মতবাদকে উপহাস করার অভিযোগও এনেছেন। ‘আমি পোপ হতে চাই’—ট্রাম্প এমন মন্তব্য করার কয়েকদিন পর তার ‘পোপ’ সাজের ছবিটি প্রকাশ্যে আসে।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবারও পোপ-প্রেসিডেন্ট দ্বন্দ্ব আরও জটিল রূপে বিশ্ববাসীর সামনে এলো।

সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ট্রাম্পের সঙ্গে স্বদেশি লিওর দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র গঠনের ২৫০ বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান পোপ লিও এড়িয়ে গেছেন।

গত ১০ এপ্রিল ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট আরও এক ধাপ এগিয়ে জানায়—পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যে, ট্রাম্পের শাসনামলে পোপ যুক্তরাষ্ট্র সফরে যেতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

মূলত ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই বিশ্ব নেতার মতপার্থক্য প্রবল হয়েছে। কেননা, শান্তি আলোচনা চলার মধ্যে ইরানে আচমকা হামলা করায় পোপ লিও যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

ইরানে নিরীহ মানুষ হত্যা করায় মার্কিন নেতাদের হাতে রক্ত লেগেছে বলেও মন্তব্য করেন পোপ।

তার মতে, যারা শান্তিরক্ষা করেন তারা ‘আশীর্বাদপুষ্ট’। যাদের হাতে রক্ত লেগে আছে তাদের প্রার্থনা কবুল হয় না।

অন্যদিকে, ইরানকে ‘সন্ত্রাসী’ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় পোপের তীব্র নিন্দা করেন ট্রাম্প। তিনি উল্টো পোপকে ‘অপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল’ বলেও তিরস্কার করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ‘নাক না গলানোর’ জন্য পেন্টাগনের পক্ষ থেকে ভ্যাটিকানকে সতর্ক করা হয়েছে বলেও ব্রিটিশ দৈনিকটির প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এর আগের দিন, অপর ব্রিটিশ দৈনিক টাইমস জানায়—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভ্যাটিকানের সম্পর্ক ভঙ্গুর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। পেন্টাগনের সঙ্গে ভ্যাটিকানের হয়ে যাওয়া এক ‘গোপন’ বৈঠককে ‘প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি’ বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়েছে।

পোপ-প্রেসিডেন্টের এমন সংঘাত এই দুই দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ট্রাম্পভক্ত ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ভ্যাটিকানের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, পোপের অধিকার আছে শান্তির পক্ষে কথা বলার ও সব ধরনের যুদ্ধের নিন্দা করার।

প্রিয় মানুষ হলেও ট্রাম্প ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে ছাড়েননি। তার মতে, মেলোনি বদলে গেছে। তার মন্তব্য ‘অগ্রহণযোগ্য’।

এ দিকে, নিজে ক্যাথলিক হয়েও মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স তার ধর্মগুরুকে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ‘পোপের উচিত নৈতিকতা সম্পর্কিত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া।’ আমেরিকার সরকারি নীতি কী হবে তা ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

তার এমন মন্তব্যে সমালোচনা ঝড় উঠে। বিশ্লেষকরা বলেন, যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই তো নৈতিকতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যা পোপ দেখিয়েছেন। বরং, ট্রাম্প ও তার শীর্ষ কর্মকর্তারাই ধর্মের নাম নিয়ে অধর্ম করছেন। তারা অযথাই যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছেন। নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করছেন।

 

গতকাল ১৫ এপ্রিল সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে জানানো হয়—মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে রিপাবলিকানরা সমস্যায় থাকলেও ট্রাম্পের আচরণ দেখে মনে হয় না তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এতে আরও বলা হয়—২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘ভূমিধস’ জয় পাওয়ার পর ট্রাম্প ভাবতে শুরু করেছেন যে তাকে জনতার পক্ষ থেকে ‘অভূতপূর্ব ও ব্যাপক’ ক্ষমতার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

অনেক রিপাবলিকান নেতা বলে আসছেন যে, ট্রাম্প যা করবেন তাতেই তারা সমর্থন দেবেন। যেমন, টেক্সাসের জনপ্রতিনিধি ট্রয় নেহল রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের ‘প্রতিটি শব্দের প্রতি’ সমর্থন জানিয়েছেন।

কিন্তু, একই কৌশল আগামী নভেম্বরে হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিবাচক ফল নাও দিতে পারে বলে প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানি সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প ইতোমধ্যে সম্ভাব্য ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন।

এরপর পোপের সঙ্গে ‘বাগযুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প।
শুধু তাই নয়, একসময় নিজেকে ‘পোপ’ বানানো ট্রাম্প এবার আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিজেকে যিশুর স্থলাভিষিক্ত করেছেন।

ট্রাম্পের আচরণ ক্রমাগত সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলেও সিএনএন-এর প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।

বলা হয়, পরিস্থিতি এতই বিরূপ যে, দলমত নির্বিশেষে অনেকেই এখন ট্রাম্পকে আইনগতভাবে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি কংগ্রেসকে ভেবে দেখার অনুরোধ করছেন।

একইদিনে প্রকাশিত ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন রাখা হয়—‘যিশুর বেশে ট্রাম্প: রসিকতা নাকি ধর্মদ্রোহিতা?’

এতে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ চলাকালে ও পোপের সঙ্গে বাগযুদ্ধের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প যেন মার্কিন খ্রিষ্টানদের সঙ্গে তার সম্পর্ককেই সংকটে ফেলে দিলেন।

নিউইয়র্কের সেন্ট জনস ইউনিভার্সিটির ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মশিক্ষাবিষয়ক অধ্যাপক মেগান জে ক্লার্ক সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, যিশুর বেশে নিজের ছবি প্রকাশের বিষয়ে ট্রাম্পের ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।

ট্রাম্প নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে তুলে ধরার কথা বললেও তিনি ধর্মানুভূতিতে আঘাত করেছেন। এটি বোঝার পরই সেই ছবি সমাজমাধ্যম থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই প্রথম কোনো মার্কিনি ক্যাথলিক পোপ হলেন। তাই কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপতি এখন আর বলতে পারবেন না যে—পোপ হোয়াইট হাউসের ভাষা বোঝেন না। পোপের সঙ্গে অনুবাদক নিয়ে কথা বলতে হয়। সেসব দিনের অবসান হয়েছে।
এখন পোপ ও প্রেসিডেন্ট একই ভাষায় কথা বলেন, একই উচ্চারণে-একই শব্দচয়নে।

তাই পোপ যখন বলেন, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো হুমকিতে ‘ভীত’ নন, তখন সেই বার্তা সরাসরি মার্কিন ভোটারদের কাছে পৌঁছে যায়।

তাই পোপকে নিয়ে ট্রাম্পের যেকোনো হুমকি আগামীতে ভোটের বাক্সে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করছেন অনেকে।

Related Articles

Latest Posts