যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা ভেস্তে গেল কেন?

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেস্তে গেছে। প্রায় একদিনব্যাপী ম্যারাথন বৈঠকের পরও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, এই ব্যর্থতা হঠাৎ করে নয় বরং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।

দ্য গার্ডিয়ান ও আল জাজিরা বলছে, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরান যেন পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন না করে এবং এ বিষয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমকে ‘অধিকার’ হিসেবে তুলে ধরে এবং তা সীমিত করতে অনীহা দেখায়। এই ইস্যুতেই আলোচনায় সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়।

একইসঙ্গে অর্থনৈতিক প্রশ্নও আলোচনাকে জটিল করে তোলে। ইরান চেয়েছিল বিদেশে জব্দ থাকা তাদের বিপুল সম্পদ মুক্ত করা হোক এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসব বিষয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কথা বললেও তাৎক্ষণিক ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান আরও দূরে সরে যায় বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও রয়টার্স।

দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে ইরান তার প্রভাব বজায় রাখতে চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল অবাধ থাকুক। এই দ্বন্দ্ব কেবল দ্বিপক্ষীয় নয় বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত, ফলে সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

দুই পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগও আলোচনাকে ব্যাহত করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান ‘মূল প্রতিশ্রুতি’ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘অতিরিক্ত ও অবাস্তব শর্ত’ চাপিয়ে দিয়েছে। এই দোষারোপের রাজনীতি আলোচনার পরিবেশকে আরও নেতিবাচক করে তোলে বলে উল্লেখ করেছে অ্যাক্সিওস ও আল জাজিরা।

রয়টার্স ও দ্য নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে। লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে উত্তেজনা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান এবং যুদ্ধ-পরবর্তী প্রভাব, সব মিলিয়ে এই সংলাপ কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এতে যুক্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল গভীর অবিশ্বাস। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা ইরানের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে ন্যূনতম আস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠেনি বলেও জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।

সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের এই আলোচনা আবারও দেখিয়ে দিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্ব কেবল একটি ইস্যুর নয় বরং বহুস্তরীয়। পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং কৌশলগত অবিশ্বাস, এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাদের বিরোধ। এই বাস্তবতায় দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যে কঠিন, তা নতুন করে প্রমাণিত হলো।

ম্যারাথন আলোচনা ব্যর্থ হলেও কূটনৈতিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আন্তর্জাতিক মহল এখনো আশা করছে, ভবিষ্যতে নতুন কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে দুই পক্ষ আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে। তবে আপাতত ইসলামাবাদের সংলাপ ব্যর্থ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও অনিশ্চয়তার দিকেই এগোচ্ছে।

Related Articles

Latest Posts