মধ্যপ্রাচ্যের টানটান উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সবার নজর এখন পাকিস্তানের দিকে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে এবং ইরানের প্রতিনিধিরাও সেখানে অবস্থান করছেন।
প্রায় ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তান এই আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং রাজধানীজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আলোচনার স্থান ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং এটিকে ‘মেক অর ব্রেক’ পর্যায়ের আলোচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে ব্যাক-চ্যানেল যোগাযোগের মাধ্যমে আগে থেকেই কিছু সমঝোতার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব হয়।
তবে আলোচনার পরিবেশ শুরু থেকেই জটিল হয়ে উঠেছে। ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, লেবানন ইস্যুতে অঙ্গীকার ছাড়া তারা আলোচনায় এগোতে রাজি নয়।
তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; লেবাননে ইসরায়েলি হামলাও বন্ধ করতে হবে এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অংশ নয় এবং মূল আলোচনার কেন্দ্র হওয়া উচিত ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। এই মৌলিক মতপার্থক্যই আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
লেবাননের পরিস্থিতি ইতোমধ্যে এই আলোচনাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলা ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সেখানে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে, যা যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ইরান বলছে, লেবাননে যুদ্ধ চলতে থাকলে পুরো যুদ্ধবিরতিই অর্থহীন হয়ে পড়বে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এটিকে আলাদা ইস্যু হিসেবে দেখছে। ফলে এই ইস্যুতে সমাধান না এলে পুরো আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আলোচনার মূল এজেন্ডায় রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করুক এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম কমাক।
বিপরীতে ইরান চায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে নিজেদের ভূমিকার স্বীকৃতি। দুই পক্ষের এই অবস্থান এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছে, যা আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে আলোচনাকে সমর্থন করলেও অন্যদিকে সতর্ক করে দিয়েছেন, আলোচনায় অগ্রগতি না হলে সামরিক বিকল্প আবার বিবেচনায় আসতে পারে।
অন্যদিকে ইরানও কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণসহ একাধিক শর্ত সামনে এনেছে। ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস এখনো কাটেনি।
সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হলেও লেবানন ইস্যু, পারমাণবিক বিরোধ এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার রাজনীতির কারণে তা অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনায় অগ্রগতি হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। তবে ব্যর্থ হলে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

