পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি আলোচনার নেপথ্যে চীন?

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ থামাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চীন, এমনটাই বলছেন কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকরা। ইসলামাবাদে বৈঠকের আগে থেকেই বেইজিংয়ের সক্রিয় কিন্তু নীরব ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান অল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শেষ মুহূর্তে এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব করতে চীনের হস্তক্ষেপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধবিরতির রাতে যখন আলোচনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল, তখনই চীন সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং ইরানকে প্রাথমিক সমঝোতায় রাজি করায়।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও, যিনি জানিয়েছেন, ইরানকে আলোচনায় আনতে চীন বড় ভূমিকা রেখেছে।

স্থায়ী সমাধানে চীন ‘কী ফ্যাক্টর’?

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনায় চীন হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘গ্যারান্টর’। কারণ ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা শক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না এবং এমন একটি পক্ষ চায়, যাকে তারা নিরপেক্ষ ও প্রভাবশালী মনে করে।

রাশিয়াও একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারত, কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোকে গ্রহণযোগ্য মনে করছে না। ফলে চীনই বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে।

পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের প্রভাব

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। ‘আয়রনক্ল্যাড ব্রাদার’ হিসেবে পরিচিত দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রেখে চলেছে।

চীন ইতোমধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাকিস্তানে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গেও তাদের শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে দুই পক্ষের সঙ্গে সমানভাবে যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রে বেইজিং একটি বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

আলোচনার মূল চ্যালেঞ্জ

তবে এই আলোচনা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবানন ইস্যু, এসব বিষয় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষ করে লেবানন নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট। পাকিস্তান ও ইরান যেখানে যুদ্ধবিরতির আওতায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, সেখানে ইসরায়েল তা মানতে নারাজ এবং হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

‘কঠিন পথচলা’ সামনে

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই আলোচনা অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল। একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে।

এদিকে, চীন প্রকাশ্যে খুব বেশি ভূমিকা নিতে না চাইলেও পর্দার আড়ালে তাদের সক্রিয়তা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন এবং বিশেষ দূত যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে নিয়মিত সফর করছেন।

সব মিলিয়ে ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া এই আলোচনা শুধু পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্যের পরীক্ষা নয় বরং চীন কতটা কার্যকরভাবে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করতে পারে, সেটিও এখন বৈশ্বিক রাজনীতির বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Related Articles

Latest Posts