দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের আগামী সরকারকে চীনের সামরিক সরঞ্জামের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর তৈরি অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন।
গতকাল মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামীকাল বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং পালিয়ে নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে ঢাকায় ভারতের প্রভাব কমছে এবং চীনের পদচারণা আরও গভীর হয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
সম্প্রতি ভারত সীমান্তের কাছে ড্রোন কারখানা স্থাপনে চীনের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ, যা নিয়ে চিন্তিত অনেক বিদেশি কূটনীতিক। একই সময়ে চীন ও পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ ফাইটার জেট কেনার বিষয়েও আলোচনা চালাচ্ছে ঢাকা।
রয়টার্সকে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের সম্পৃক্ততার ঝুঁকি সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে স্পষ্টভাবে অবহিত করতে আমরা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিকল্প প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা চীনের তৈরি সিস্টেমগুলোর বিকল্প হতে পারে।’
তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য দেননি তিনি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ক্রিস্টেনসেন আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক দেখতে চায়, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে সহায়তা করবে।’
বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ক্রিস্টেনসেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী। তবে তারা দেখতে চায় নতুন সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বাণিজ্যিক কূটনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের যে অগ্রগতি হয়েছে, নির্বাচিত সরকারের সাথে আমরা তা আরও এগিয়ে নিতে চাই।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি কোম্পানি শেভরন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে কাজ করলেও ১৮ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে অন্য মার্কিন কোম্পানির উপস্থিতি সীমিত। উচ্চ করহার ও লভ্যাংশ দেশে ফেরত নেওয়ার জটিলতা, বিনিয়োগে বাধা তৈরি করেছে। এ কারণে বাংলাদেশে এখনো স্টারবাকস বা ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বড় মার্কিন ব্র্যান্ডের শাখা নেই।
নির্বাচন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ যে সরকারই নির্বাচিত করুক, যুক্তরাষ্ট্র তার সাথেই কাজ করবে।’
রয়টার্সের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে নির্বাচনী লড়াই মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। বিভিন্ন জরিপে বিএনপি এগিয়ে আছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রই এককভাবে সবচেয়ে বড় দাতা দেশ।
রাষ্ট্রদূত জানান, সম্প্রতি জাতিসংঘের সাথে ২০০ কোটি ডলারের একটি বৈশ্বিক অর্থায়ন চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার একটি বড় অংশ বাংলাদেশে ব্যয় করা হবে।
তবে তিনি অন্য আন্তর্জাতিক দাতা দেশগুলোকেও এই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একাই এই বিশাল বোঝা অনির্দিষ্টকাল বহন করতে পারবে না। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের এগিয়ে আসা জরুরি।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। এর ফলে খাদ্য রেশন কমানোসহ কিছু স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

