এবার দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাল আইএমএফ

চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশের জন্য চলতি অর্থবছরের (২০২৭) জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

গত এপ্রিলে এই পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যান্য প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের মতোই বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এমন নেতিবাচক পূর্বাভাস দিল আইএমএফ।

ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় সোমবার প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এই নতুন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক প্রাক্কলনের চেয়েও কম।

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলে সম্প্রতি পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, যা গত এপ্রিলের ৪ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়ে কম। এদিকে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও (এডিবি) তাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এনেছে; জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের পূর্বাভাস দিলেও সেপ্টেম্বরে তা কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।

আইএমএফের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। এর ফলে আগের অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসার যে ইতিবাচক ধারা দেখা গিয়েছিল, তা আবারও বাধাগ্রস্ত হতে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৬ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

আইএমএফের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধির দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবে ভারত; দেশটিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া ভুটানের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি, যেখানে দেশ দুটির মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ব্যতিক্রম কেবল বাংলাদেশ, যার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস গত কয়েক বছর ধরেই ক্রমাগত নিম্নমুখী করা হয়েছে।

২০২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ, যা পরবর্তী বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৫ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এবং বিশ্বব্যাংকের ধারণা অনুযায়ী, ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত এই ধীরগতি অব্যাহত থাকতে পারে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সেই প্রত্যাশিত গতি এখনো দেখা না যাওয়ায়, তারা ২০২৭ অর্থবছরের  প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ঋণের ধীরগতি এবং কঠোর আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের অর্থনীতির এই অবনতি ঘটছে, যা আগে যতটা ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এ ছাড়া, রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও দুর্বল থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্প খাতে এই মন্দা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। এমনকি মহামারির পর এই প্রথম তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাত সংকুচিত হয়েছে।

জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যবসায়িক আস্থার অভাব, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে ২০২৬ সালের জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি বিনিয়োগও এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর কারণ হিসেবে তীব্র আর্থিক সংকট এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন জটিলতাকে দায়ী করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন স্বল্পমেয়াদে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইএমএফের জিডিপি প্রজেকশন নিয়ে বিতর্ক করতে চাই না। তবে বাজেটে দেওয়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে আশা করি।’

আজ মঙ্গলবার সকালে ব‍্যাংককে আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার সাইডলাইনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আইএমএফ তাদের হিসাব দিয়েছে। আমরা আমাদের কাজ করছি। আশা করছি বাজেটে যে প্রোজেকশন দিয়েছি তা অর্জন করা যাবে।’

চলতি অর্থবছরের বাজেটে চলতি অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে আইএমএফের সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

Related Articles

Latest Posts