ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে গতকাল সোমবার দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভ ও সমাবেশের নির্ধারিত স্থান হিসেবে যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে রাজধানীতে বিক্ষোভের জন্য তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন স্থানগুলো হলো রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান।
একসময় জ্যোতির্বিদ্যার পর্যবেক্ষণাগার হিসেবে নির্মিত যন্তর মন্তর কীভাবে ভারতের অন্যতম পরিচিত প্রতিবাদস্থলে পরিণত হলো, সেখানে কোন কোন উল্লেখযোগ্য আন্দোলন হয়েছে, তা নিয়ে এ প্রতিবেদন।
১৮ শতকের ঐতিহাসিক স্থাপনা
দিল্লির যন্তর মন্তরের আদি নাম ছিল ‘যন্ত্র মন্ত্র’। মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের নির্দেশে জয়পুরের মহারাজা সওয়াই জয়সিংহ দ্বিতীয় এটি নির্মাণ করেন। আনুমানিক ১৭২৪ সালে নির্মিত এই পর্যবেক্ষণাগারে খালি চোখে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হতো।
স্থাপনাটি ইটের খোয়া দিয়ে নির্মিত স্থাপনাটিতে চুনের প্রলেপ দেওয়া। এর প্রধান চারটি যন্ত্র হলো সম্রাট যন্ত্র, রাম যন্ত্র, জয়প্রকাশ যন্ত্র ও মিশ্র যন্ত্র। সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের অবস্থান এবং গতিবিধি নির্ণয়, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি তৈরি ও সময় গণনা ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
যন্ত্র ও গণনা—এই দুটি ধারণা থেকেই ‘যন্তর মন্তর’ নামের উৎপত্তি। এটি ছিল সওয়াই জয়সিংহ দ্বিতীয়ের নির্মিত পাঁচটি যন্তর মন্তরের মধ্যে প্রথম। অন্য চারটি নির্মিত হয়েছিল জয়পুর, উজ্জয়িনী, মথুরা ও বারাণসীতে। মথুরার স্থাপনাটি এখন আর টিকে নেই।
প্রধান চারটি যন্ত্র ছাড়াও পুরো কমপ্লেক্সে রয়েছে ১৪টি জ্যামিতিক যন্ত্র। এগুলোর সাহায্যে সময় নির্ণয়, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, গ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও আকাশে জ্যোতিষ্কের উচ্চতা পরিমাপ করা হতো। যন্ত্রগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে কম্পনের প্রভাব কম পড়ে এবং নির্দিষ্ট দিকের সঙ্গে সেগুলোর সঠিক অবস্থান বজায় থাকে।
দিল্লির প্রতিবাদের মানচিত্রে ‘যন্তর মন্তর’
দিল্লিতে বিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে যন্তর মন্তরের উত্থান এক দিনে হয়নি। এর আগে বোট ক্লাবের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে বড় বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। গো-হত্যাবিরোধী বিক্ষোভ ও রাম জন্মভূমি আন্দোলন ঘিরে সমাবেশের জন্যও স্থানটি পরিচিত ছিল।
পরবর্তীতে রামলীলা ময়দান সরকারবিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন সরকারি নীতির প্রতিবাদে সেখানে হাজারো মানুষ সমবেত হতেন। দুর্নীতিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া এগেইনস্ট করাপশন’ আন্দোলনেরও অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল রামলীলা ময়দান।
ধীরে ধীরে যন্তর মন্তর রাজনৈতিক দল, বিরোধী জোট, অধিকারকর্মী ও নাগরিক সংগঠনের দাবিদাওয়া তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে ওঠে। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদলগুলোর বিক্ষোভের কেন্দ্রও এটি।
সংসদের কাছাকাছি হওয়ায় বিশেষ গুরুত্ব
ভারতের সংসদ ভবন থেকে তিন কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে ‘যন্তর মন্তর’। এ অবস্থান একে বিক্ষোভকারীদের জন্য প্রতীকী গুরুত্ব এনে দিয়েছে। সংসদের উচ্চনিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকার বাইরে থেকেও এখানে দাঁড়িয়ে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব।
এ ছাড়া, সংসদ অধিবেশন চলাকালে অনেক রাজনৈতিক নেতা ও আইনপ্রণেতা সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে সরাসরি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। ফলে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে আন্দোলনকারীদের কাছে স্থানটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জন লোকপাল বিলের দাবিতে আন্না হাজারের অনশন
২০১১ সালের ৫ এপ্রিল দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতা আন্না হাজারে যন্তর মন্তরে অনশন করেন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি ‘জন লোকপাল বিল’ প্রণয়নের দাবিতে তিনি এ কর্মসূচি পালন করেন।
তার অনশনকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি ও জবাবদিহিতা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। শত শত সমর্থক যন্তর মন্তরে জড়ো হন। তাদের কেউ অনশনে যোগ দেন, আবার কেউ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান।
নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের পর বিক্ষোভ
২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে ২৩ বছর বয়সী এক ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর মারা যান। এ ঘটনার প্রতিবাদে ৩০ ডিসেম্বর রাতে যন্তর মন্তরে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন।
তারা ন্যায়বিচার ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানান। শুরুতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরদিন কয়েকজন আন্দোলনকারী মধ্য দিল্লির দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।
নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন
২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও প্রস্তাবিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) বিরোধিতায় হাজারো মানুষ যন্তর মন্তরে সমবেত হন। মান্ডি হাউস ও লালকিল্লাসহ কয়েকটি স্থান থেকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেলে পুলিশ বাধা দেওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হন।
একই বছরের ২৫ ডিসেম্বরও সেখানে বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ওই কর্মসূচির আগে মান্ডি হাউসের আশপাশে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। ফলে অনেক বিক্ষোভকারী অন্য জায়গায় জড়ো হয়ে পরে নির্ধারিত স্থানের দিকে যান।
কুস্তিগিরদের অবস্থান কর্মসূচি
২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি অলিম্পিয়ান ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কুস্তিগির ভিনেশ ফোগাত, সাক্ষী মালিক ও বজরং পুনিয়া যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি করেন। ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশন ও এর তৎকালীন সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে তারা অভিযোগ তোলেন।
ভিনেশ ফোগাত অভিযোগ করেন, নারী কুস্তিগিরেরা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তবে ব্রিজভূষণ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর এবং অভিযোগ তদন্তে তদারকি কমিটি গঠনের আশ্বাস পেয়ে আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে কর্মসূচি স্থগিত করেন। তবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি অভিযোগ করে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল তারা আবার আন্দোলনে ফেরেন।
সে বছর ২৮ এপ্রিল ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের এফআইআর দায়েরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান কুস্তিগিরেরা। তবে পরবর্তী পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। এর কয়েক দিন পর ৩ মে বিক্ষোভস্থলে আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এনইইটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে সিজেপির আন্দোলন
২০২৬ সালের ২০ জুন এনইইটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে তরুণদের ব্যাঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
সে বছর ২৮ জুন আন্দোলনে যোগ দিয়ে পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করলে কর্মসূচিটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। শুরুতে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলেও পরে তা তরুণদের বেকারত্ব, নিয়োগ পরীক্ষা ও সুশাসনের মতো বিষয়েও বিস্তৃত হয়।
আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। এনইইটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পাশাপাশি সিবিএসইর অন-স্ক্রিন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিও জানান তারা। শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলনটির অবসান ঘটে।
বিক্ষোভের স্থান বদল, বিতর্কের নতুন অধ্যায়
দীর্ঘ ইতিহাসে যন্তর মন্তর ভারতের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, নারীর নিরাপত্তার দাবিতে বিক্ষোভ, নাগরিকত্ব আইনবিরোধী কর্মসূচি ও ক্রীড়াঙ্গনের যৌন হয়রানির অভিযোগের মতো নানা ইস্যুতে মানুষের সমাবেশস্থল হয়েছে।
কিন্তু গত ১২ অক্টোবর দিল্লি পুলিশের সিদ্ধান্তের ফলে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বাতিল হয়েছে। এখন থেকে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও সিবিডি ময়দানে বিক্ষোভ আয়োজন করতে হবে।
পুরোনো দিল্লির রামলীলা ময়দান, যা যন্তর মন্তর থেকে অন্তত চার কিলোমিটার দূরে। দ্বিতীয় স্থান পূর্ব দিল্লির সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট (সিবিডি) ময়দান। এটি মধ্যদিল্লির যন্তর মন্তর থেকে অন্তত ১২ কিলোমিটার দূরে। তৃতীয় এলাকা উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান। এই জায়গাটার দূরত্ব যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার।
তবে সিজেপিসহ সব বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠন সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
আজ মঙ্গলবার তালাবদ্ধ ফটক টপকে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করার পর সিজেপির তিন নেতা সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা ও অজিঙ্কা শিন্ডেকে আটক করেছে পুলিশ। পরে তাদের জাফরপুর থানায় নেওয়া হয়। এরপরও সিইসির পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছে ককরোচরা। তারা বলছে, যত যাই হোক বিক্ষোভ চলবে।

