দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সবচেয়ে বেশি আসে সৌদি আরব থেকে। সেখানে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ থমকে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত দেশের অর্থনীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি থাকেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সেখানকার প্রবাসীরা ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা দেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ।
গত অর্থবছরে সৌদি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল ওই বছরের মোট প্রবাহের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
সম্প্রতি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের অর্থনীতিকে তেলনির্ভর থেকে বাণিজ্য ও পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরের যে পরিকল্পনার কথা জানান, তাতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক অদক্ষ শ্রমিকের জন্য আশার আলো তৈরি হয়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বৃহত্তম গন্তব্য। শুধু সেপ্টেম্বরেই ৩২ হাজার ৯১৫ কর্মী নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সৌদি অর্থনীতি নতুন রূপে গঠনের আগেই সালমানের ট্রিলিয়ন ডলারের মহাপরিকল্পনা এখন ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলায় ঝুঁকিতে পড়েছে।
বিমানবন্দরসহ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা যদি দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে তা হবে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য চরম দুঃসংবাদ।
এ প্রসঙ্গে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যেতে পারে এবং একপর্যায়ে প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন।
হুতি হামলার পর সৌদির সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্লাইট কার্যক্রম স্থগিত করেছে। দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিতভাবে চালু আছে।
এতে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বাংলাদেশের অসংখ্য প্রবাসীকর্মী।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২২টি সরাসরি ও ৩৯টি ট্রানজিটসহ মোট ৬১টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে অন্তত ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রীর ওপর।
যে প্রবাসীকর্মীদের কাজে যোগ দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ফ্লাইট মিস করাটা তাদের চাকরি টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি তৈরি করেছে। অন্যদিকে ভিসার মেয়াদ নবায়ন ও নতুন করে ফ্লাইটের টিকিট করার খরচ সামলাতেও তাদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
যদিও, এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহে তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়েনি, তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়ার বিষয়ে ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
গণমাধ্যমকে গতকাল তিনি জানান, সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন বাজার এবং দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে।
জিল্লুর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এদিকে, বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশই আসে সৌদি আরব থেকে।
শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন। ওই হামলায় মোট অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন।
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। প্রথমে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও তাদের মধ্যে চারজন এখন ঝুঁকিমুক্ত।
দূতাবাসের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজা-ই-রাব্বির সই করা প্রতিবেদনে বলা হয়, ওমরাহ ভিসায় যাওয়া সাফাত রহমান এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন।
প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাকি ১২ আহত শ্রমিককে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
দূতাবাস জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো জরুরি সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত আছে।
একইসঙ্গে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকতে, ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা এড়িয়ে চলতে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দূতাবাস আরও সতর্ক করে বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘাত সম্পর্কিত ছবি, ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহ, শেয়ার বা প্রকাশ করা সৌদি আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে। ফলে প্রবাসীদের ফোনে এসব তথ্য বা ফাইল রাখা ও আদান-প্রদান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর সংঘাতের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোর সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন এড়িয়ে বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। এই সংঘাত বাংলাদেশকে কঠিন কূটনৈতিক পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।’

