বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে মেঘনা নদীতে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চলছে ইলিশ শিকার। নদী তীরের অন্তত ৩০টি বাজারে প্রতিদিন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। সেখানে স্বাভাবিক সময়ের প্রায় অর্ধেক দামে মাছ পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের বাজারগুলো এখন ছোট ও মাঝারি আকারের ইলিশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। সেই তুলনায় বড় আকারের ইলিশ কম। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষে বেশি দামে বিক্রির জন্য বড় মাছগুলো মজুত করা হচ্ছে।
হিজলার দড়ির চর-খাজুরিয়া বাজার, ধুলখোলা ইউনিয়নের আলীগঞ্জ বাজার, মেমানিয়া ইউনিয়নের একতা বাজার, বড়জালিয়া ও হরিনাথপুর বাজারে প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে।
একইভাবে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার কালীগঞ্জ, দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়নের বুড়ির পুল, হাজিরহাট, আলিমাবাদ ইউনিয়নের আলীগঞ্জ, চর গোপালপুর, জাঙ্গালিয়া ও ভাসানচর ইউনিয়নের বাজারগুলোতেও ইলিশ বেচা-কেনা চলছে।
মেঘনা নদীর পাড়ে প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি হতে দেখেছেন হিজলার বাসিন্দা আনিসুর রহমান। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, জেলেরা নৌকা নিয়ে নদীর পাড়ে এসে মাছ বিক্রি করছিলেন। গতকাল রোববার এক কেজি ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৫০০ টাকা, ৬০০-৮০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার টাকা এবং এর চেয়ে ছোট ইলিশ ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দাম এখন প্রায় অর্ধেক। এসব জায়গা থেকে মাছ কিনে খুচরা বিক্রেতারা দূরের বাজারে কেজিতে ১০০-২০০ টাকা লাভে বিক্রি করছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ইলিশ ধরা ও কেনাবেচায় স্থানীয় কিছু সিন্ডিকেট কাজ করছে। এ ছাড়া, সীমিত লোকবল দিয়ে সবসময় বিস্তীর্ণ এলাকায় অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। ইঞ্জিনচালিত সরকারি নৌকা দেখলেই জেলেরা ছোট খালে ঢুকে পড়ছেন।
হিজলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইলিয়াস শিকদার এবং মেহেন্দীগঞ্জের ইউএনও মোহাম্মদ রিয়াজুর রহমান অবৈধ মাছ শিকার ও সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার করেন।
হিজলার ইউএনও মো. ইলিয়াস শিকদার বলেন, ‘বাজারগুলোতে খুব ভোরে ফজরের আজানের সময় এবং রাতে মাছ বিক্রি হয় বলে শুনেছি। সাধারণত রাতের অন্ধকারে উত্তাল নদী পার হয়ে অভিযান চালানো হয় না। এ ছাড়া নদীর এক পার থেকে অন্য পারে যেতেও অনেক সময় লাগে। তারপরও আমরা অভিযান চালাচ্ছি। বেশ কিছু ইলিশ উদ্ধার করে এতিমখানায় দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদেরও বিষয়টি দেখতে বলেছিলাম। তারা বলেছেন, কিন্তু আমরা কোনো ফলাফল দেখছি না।’
মেহেন্দীগঞ্জের ইউএনও মোহাম্মদ রিয়াজুর রহমান সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘বিশাল নদ-নদী থাকায় আমরা মাছ শিকার থামাতে পারছি না। আমরা জেলেদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভাও করেছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।’
মেহেন্দীগঞ্জের মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘অভিযানের জন্য আমরা নদীতে নামলেও জেলেরা বেপরোয়া। তারা আমাদের ওপর হামলা করছে। বাধ্য হয়ে কোস্টগার্ডকে ফাঁকা গুলিও ছুড়তে হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ লাখ মিটার জাল ও ৩৫ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রভাব বিস্তারের জন্য স্থানীয় নেতারাই এসব সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন। যারা এখন সিন্ডিকেট চালাবেন, আগামী নির্বাচনে তারাই এগিয়ে থাকবেন বলে তাদের ধারণা।
মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলায় এমন অন্তত ৮ থেকে ১০টি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাছ বিক্রির অর্ধেক টাকা এই সিন্ডিকেটের পকেটে যায়।
বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘৩১৮ কিলোমিটারজুড়ে থাকা এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অভয়াশ্রমটির পাহারায় হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে মৎস্য কর্মকর্তা আছেন মাত্র চারজন। সন্ধ্যার পর নদী ভয়ংকর রূপ নেয়, তখন সেখানে যাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া এবার আমাদের বাজেট নেই বললেই চলে। ফলে আগের চেয়ে অভিযানও কম হচ্ছে।’
সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেটের কথা আমরা শুনেছি। তবে তারা সামনে না আসায় আমরা কিছু করতে পারছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ধারণা, বরিশাল জেলার অন্তত ৫০টি বাজারে অবৈধভাবে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। এর বেশির ভাগই হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়। তবে এসব মাছ মূলত খুব ভোরে ও রাতে বিক্রি করা হয়।’
বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মামুন খন্দকার বলেন, ‘জায়গাটি অনেক বড়। আমরা এক দিকে গেলে তারা অন্য দিকে মাছ ধরে। তবে আমরা অভিযান জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এদিকে মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বরিশাল জেলার ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬ জন জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

